ওয়াশিংটনকে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করার জন্য এবার ধর্মীয় ও আদর্শিক বার্তার জোরালো আশ্রয় নিয়েছে তেহরান। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৯৪ নম্বর আয়াতের সুস্পষ্ট উদ্ধৃতি দিয়ে আইআরজিসির শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হলে ইরান বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না, বরং আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে সমান শক্তিতে তার চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী পাল্টা জবাব দেবে।
শনিবার, ১৮ জুলাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবির আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাতে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উত্তেজনাকর খবরটি প্রকাশ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক সামরিক অভিযান এবং ঠিক তার পরপরই মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর ইরানের সামরিক বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধমূলক হামলার জেরে পুরো অঞ্চলে যে ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, মূলত সেই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটেই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হলো।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই পাল্টা হামলার যৌক্তিকতা অত্যন্ত পরিষ্কার ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আইআরজিসি বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্তমানে এমন কোনো কার্যকর ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অবশিষ্ট নেই, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা, বেআইনি ও আধিপত্যবাদী সামরিক অভিযানগুলো রুখে দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই চরম নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতার কারণেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানের সামনে সামরিক উপায়ে পাল্টা আক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো যৌক্তিক, কূটনৈতিক বা আইনি পথ খোলা নেই।
নিজেদের এই আপসহীন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধতা ও অনুপ্রেরণা জোগাতেই সামরিক বিবৃতিতে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ১৯৪ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “কেউ যদি তোমাদের ওপর আক্রমণ করে, তবে তোমরাও তাদের ওপর সমান আক্রমণ করো।”
এই অত্যন্ত জোরালো ধর্মীয় বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত সমগ্র বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপই আগ্রাসনের শিকার হওয়ার পর কেবল নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার তাগিদেই পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের এই কড়া ও চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব মিত্র দেশ দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনকে সহায়তা করে আসছে, তাদের জন্যও এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বয়ে এনেছে।
আইআরজিসি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ও প্রকাশ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে, আঞ্চলিক যেসব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন পরিচালনায় আকাশপথ বা লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করছে, তাদের প্রত্যেককেও চরম মূল্য চোকাতে হবে।
তেহরান অত্যন্ত নির্দ্বিধায় স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ইরানের পবিত্র মাটিতে সামান্যতম কোনো হামলা হলেও, সেই হামলায় ব্যবহৃত আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও নির্দ্বিধায় বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোকে এর চূড়ান্ত ও ভয়াবহ জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সর্বশেষ ও ভয়ংকর হুঁশিয়ারি ঠিক এমন এক সংকটময়, সংবেদনশীল ও উত্তেজনাকর সময়ে সামনে এসেছে, যখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিরঙ্কুশ সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার পাল্টাপাল্টি নৌ হামলা, আকাশপথে মহড়া ও সামরিক উসকানি চলছে।
ভৌগোলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সচল থাকার প্রধান ধমনি হিসেবে সুপরিচিত। কারণ, প্রতিদিন এই আন্তর্জাতিক পানিপথ দিয়েই বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এশিয়া, ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাত নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এক নজিরবিহীন ও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাদের সুচিন্তিত মতে, হরমুজ প্রণালি এবং তৎসংলগ্ন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেভাবে সামরিক তৎপরতা, রণতরীর উপস্থিতি ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে এই চরম উত্তেজনা কমার কোনো ধরনের বাস্তব, কার্যকর ও ইতিবাচক লক্ষণ আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।
পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানের এই চরম অনমনীয় অবস্থান এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে যুক্ত করে সামরিক প্রতিরোধের প্রকাশ্য ঘোষণা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধ্বংসাত্মক ও সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে বিপজ্জনকভাবে ধাবিত করছে।
এমন এক সংঘাতময় ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার যে খুব শিগগিরই এক ভয়াবহ বিপর্যয় ও মহামন্দার সম্মুখীন হতে চলেছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে চরম ও গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।