সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

ইরানের নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

 

রোববার ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা (এইওআই) আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান চরম বৈরিতা ও সামরিক সংঘাতের অংশ হিসেবে এই নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটল, যা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক যুদ্ধাবস্থায় রূপ নিয়েছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত পরমাণু শক্তি সংস্থার এক বিশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সব আইন ও নীতিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে অত্যন্ত বর্বর ও আগ্রাসী এক পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী এই হামলা পরিচালনা করেছে।

 

ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত নির্মাণাধীন 'দারখোভিন' পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে রোববার ভোরে কয়েকটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় পারমাণবিক স্থাপনাটির ঠিক কী ধরনের এবং কতখানি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং এর কৌশলগত প্রভাব নিরূপণের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে বিস্তারিত পর্যালোচনা ও কারিগরি মূল্যায়ন চলছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় সময় রোববার ভোর ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনায় এই মার্কিন হামলাটি সংঘটিত হয়। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বেসামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা।

 

উল্লেখ্য, এই দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একটি অন্যতম প্রধান ভবিষ্যৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।

 

এমন একটি নির্মাণাধীন পারমাণবিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর ঘটনাকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যৎ পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা এক নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।

 

মার্কিন এই তীব্র সামরিক অভিযানের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও বসে নেই। তারা মার্কিন হামলার তাৎক্ষণিক ও বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সব স্থাপনা, ঘাঁটি এবং কৌশলগত অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যাপক হামলা পরিচালনা করেছে।

 

দুই পক্ষের এই ধারাবাহিক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ফলে পুরো অঞ্চল এখন এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অথচ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই ও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক স্তরে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছিল।

 

গত জুন মাসে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সেই শান্তি প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে তেহরান বাধা দিচ্ছে-এমন একটি গুরুতর অভিযোগ এনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানে এই নতুন ও ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই হামলা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখান থেকে কূটনৈতিক উপায়ে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

- এএফপি, আনাদোলু