প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে আসা অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র এবং এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এসেছে।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই অত্যন্ত বিতর্কিত অনুমোদনটি দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মাঝে এক নতুন মাত্রার পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে বলে বিশ্বজুড়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তার একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এই বিশেষ খসড়া চুক্তিটি বর্তমানে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার জন্য এটি এখন কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও নিবিড় আলোচনাটি মূলত গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও উদ্ভূত কিছু ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর প্রদানের বিষয়টি ঝুলে ছিল।
এই চুক্তির স্বাক্ষর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রধান সূত্রগুলো। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত ও চরম যুদ্ধাবস্থা চলছে, তা-ই ছিল ট্রাম্পের এই চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার অন্যতম প্রধান কারণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে, ইরান যেন কোনোভাবেই তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, মূলত সেই কৌশলগত লক্ষ্য নিশ্চিত করতেই তারা ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান শুরু করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো সংবেদনশীল অনুমোদন দিলে তা ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের মতে, এই বিতর্কিত পারমাণবিক চুক্তিতে হোয়াইট হাউস চূড়ান্ত স্বাক্ষর করলে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির একাংশও এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করতে পারেন।
এই ধরনের তীব্র রাজনৈতিক অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে এই ফাইলে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিলেন। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই সম্ভাব্য চুক্তির সুদূরপ্রসারী ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিএনএনকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে একাধিক বিশেষজ্ঞ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে, এই চুক্তি সৌদি আরবকে খুব সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গোপন সক্ষমতার দিকে ধাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অতীতের কিছু সামরিক ও রাজনৈতিক বিবৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সরাসরি হুমকি প্রদান করেছিলেন যে, তাদের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও চরম প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ইরান যদি কোনো উপায়ে পারমাণবিক বোমার মালিক হতে সক্ষম হয়, তবে সৌদি আরবও নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।
যুবরাজের সেই পুরোনো হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের এই নতুন অনুমোদন মধ্যপ্রাচ্যে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার দুয়ার উন্মোচন করে দিতে পারে। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিষয়টিতে মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য বা প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের গণমাধ্যম শাখা থেকে সিএনএনকে গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির ওপর দৃষ্টিপাত করতে বলা হয়েছে।
সেই সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে তৎকালীন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছিলেন যে, দীর্ঘ আলোচনার পর তারা সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সুরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে তারা মূলত সৌদি আরবের সঙ্গে মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও বহুগুণ বাড়াতে চান।
এর মাধ্যমে যেমন সৌদি আরবে অত্যাধুনিক মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তির নিরাপদ স্থানান্তর ও ব্যবহার নিশ্চিত হবে, ঠিক তেমনি বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা সম্পূর্ণ অটুট থাকবে। তবে বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।