দেশটির আইনসভার শীর্ষ কর্মকর্তা অর্থাৎ পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, ইসলামী বিপ্লবের প্রজ্ঞাবান নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দেওয়া জাতীয় ঐক্য রক্ষার সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চললেই কেবল বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে চলমান কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতি সুদৃঢ় করে বহিঃশত্রুর যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উসকানি মোকাবিলার ক্ষেত্রে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের এই প্রকাশ্য ঐকমত্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী একটি বার্তা বহন করে।
রোববার, উনিশে জুলাই জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত পোস্টে স্পিকার গালিবাফ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে নিজের ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান স্পষ্ট করেন।
তিনি তার ওই বার্তায় উল্লেখ করেন যে, সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে পবিত্র ঐক্যের ওপর যে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, তা নিছক কোনো সাধারণ নৈতিক বা সামাজিক স্তরের পরামর্শ নয়; বরং বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংঘাতময় প্রেক্ষাপটে এটি শত্রুর বিরুদ্ধে সার্বিক সংগ্রামে কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের জন্য একটি অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য পূর্বশর্ত।
মূলত দেশের আপামর জনসাধারণ এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি সুদৃঢ়, মজবুত ও অভেদ্য মেলবন্ধন তৈরির লক্ষ্যেই তিনি এই সময়োপযোগী মন্তব্য করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
পার্লামেন্ট স্পিকার তার বিবৃতিতে আরও যোগ করেন যে, জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব পালনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ নেতার দেওয়া ধর্মীয় ও জাতীয় দিকনির্দেশনাকে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক ও কর্মকর্তাকে অবশ্যই অত্যন্ত আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।
গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এই নির্দেশনার আক্ষরিক ও আদর্শিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল জাতির জন্য যেকোনো আগ্রাসনের বিপরীতে চূড়ান্ত বিজয় সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তার এই সুচিন্তিত বক্তব্য মূলত সমগ্র ইরানি জাতির প্রতি এক শক্তিশালী রাজনৈতিক আহ্বান, যা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে ইস্পাতকঠিন করার সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্পিকার গালিবাফের এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি ঠিক এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যার ঠিক এক দিন আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সমগ্র জাতির উদ্দেশে জাতীয় ঐক্যের এক বিশেষ ও অত্যন্ত জরুরি আহ্বান জানিয়ে একটি বার্তা প্রদান করেছিলেন।
সর্বোচ্চ নেতা তার সেই দিকনির্দেশনামূলক বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, দেশের সাধারণ জনগণ এবং রাষ্ট্রের সব পর্যায়ের দায়িত্বশীল প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি পবিত্র ও অবিচ্ছেদ্য ঐক্য বজায় রাখা বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মতে, দীর্ঘদিনের লালিত ইসলামী বিপ্লবের উচ্চ আদর্শগুলোকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা এবং বিশেষ করে যাকে তিনি 'অপরাধী ও কূটকৌশলী মার্কিন শত্রু' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তাদের যেকোনো গভীর ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের মুখে ইরানের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এই অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সংহতি একেবারেই অপরিহার্য ও বিকল্পহীন।
এদিকে, ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে যখন এমন ঐক্যের জোরালো ডাক দেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রেও এর একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার ধারাবাহিক সামরিক উত্তেজনার এক নতুন ও বিপজ্জনক অংশ হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে অত্যাধুনিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ মূলত পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি ইরানের একটি অত্যন্ত জোরালো ও প্রত্যক্ষ সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের ভেতরে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার ভিত মজবুত করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ঠিক তেমনি সামরিক বাহিনীও বহিঃশত্রুর যেকোনো আগ্রাসনের অত্যন্ত কঠোর, বিধ্বংসী ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে যে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে, কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে চালানো এই ড্রোন হামলা তারই একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তব প্রমাণ।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অত্যন্ত নিবিড় ও সতর্ক পর্যবেক্ষণে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ইরানের এই দ্বিমুখী কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের সুদৃঢ় আদর্শিক দিকনির্দেশনা ও জাতীয় ঐক্যের উদাত্ত আহ্বান, অন্যদিকে সামরিক ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন ও আপসহীন প্রতিরোধ-এই দুইয়ের নিপুণ সমন্বয়ে ইরান মূলত তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণ রাখার এক সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী রূপরেখাই পুরো বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে।