দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুসজ্জিত সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এই কঠোর বার্তা দিয়েছে। আজ সোমবার, ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রবল চাপের মুখে পড়ে জর্ডানের ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় হরমুজ প্রণালিতে দুটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
তেহরানের সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এই প্রকাণ্ড বিস্ফোরণের ফলে জাহাজ দুটি সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে এবং সেগুলোর আর চলাচলের কোনো সক্ষমতা নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটির প্রকৃত নাম, সেগুলো কোন দেশের মালিকানাধীন বা কোন দেশের পতাকাবাহী ছিল।
জাহাজে অবস্থানরত নাবিকদের পরিচয় কিংবা এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে কি না-সে বিষয়ে ইরানি সামরিক বাহিনীর তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কোনো বিবরণ এখনও পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
এমনকি রয়টার্স বা দ্য গার্ডিয়ানের মতো স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোও নিরপেক্ষভাবে এই বিস্ফোরণের ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে সক্ষম হয়নি বলে তাদের মূল প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে আইআরজিসি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আমেরিকার তথাকথিত আগ্রাসন, সামরিক হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা যতক্ষণ পর্যন্ত বজায় থাকবে, ততক্ষণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই নৌপথটি সব ধরনের বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ অনিরাপদ বলে গণ্য হবে।
তেহরান তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বক্তব্যে সরাসরি হুঁশিয়ার করে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক চরম অবনতির দিকে পৌঁছেছে যে, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য কিংবা এক ফোঁটা অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহনের জন্যও হরমুজ প্রণালিটি আর বিন্দুমাত্র নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে এক ধরনের তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও রপ্তানিকৃত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি হয়েই এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
এর পাশাপাশি, তেহরানের পক্ষ থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে অচিরেই একটি বৃহৎ আকারের ও অত্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার তীব্র তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসির এই নজিরবিহীন ও আক্রমণাত্মক ঘোষণার পর থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করে অথবা সেখানে নৌ চলাচলে বড় ধরনের কোনো সামরিক বাধা সৃষ্টি করে, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও ভয়াবহ মাত্রায় উসকে দেবে এবং শিল্পোৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
এমন একটি যুদ্ধাবস্থা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্ক দৃষ্টি এখন পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ পানিপথের দিকে নিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহল গভীরভাবে মনে করছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান তীব্র উত্তেজনা এবং প্রতিনিয়ত চলা পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এক অনাকাঙ্ক্ষিত, ধ্বংসাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের প্রধান শক্তিধর দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবিলম্বে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র প্রতিনিয়ত আরও বেশি জটিল ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করছে।
আন্তর্জাতিক নৌপথের অবাধ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এখন বৈশ্বিক নেতাদের অত্যন্ত দ্রুত, বিচক্ষণ ও কার্যকর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি সময়ের সবচেয়ে বড় ও জরুরি দাবি হয়ে উঠেছে।