গত রোববার এশিয়ার অন্যতম মিত্র দেশ ফিলিপাইনে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কো রুবিও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান মনোভাব ও গভীর উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে ইরান এই প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান ধমনীটিকে জিম্মি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা এবং এটিকে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী অবাধ ও নিরাপদ নৌপরিবহন ব্যবস্থা সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কোনো ধরনের আপস করবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ নিষ্কণ্টক রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও যেমন শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে, ভবিষ্যতেও পরিস্থিতি অনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন তার সবকিছুই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে করে যাবে বলে তিনি তার দেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের দায়িত্ব হতে পারে না বলে মনে করেন মার্কো রুবিও। এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বজায় রাখার বিশাল ও ব্যয়বহুল এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তি ও মিত্র দেশগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই এই অঞ্চলে তার নিজস্ব দায়িত্ব পালন করে যাবে। তবে বৃহত্তর স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য দেশগুলোকেও এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব করেন যে, মিত্র দেশগুলো যেন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা ও টহল কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে অথবা আর্থিকভাবে এই বিশাল নিরাপত্তা ব্যয়ের একটি যৌক্তিক অংশ বহন করতে সম্মত হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিস্ফোরণোন্মুখ। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল চলাচলের পথ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধের হুমকি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মূলত এই অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতাকেই ইরান তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে বলে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের বদ্ধমূল ধারণা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্য উপসাগর এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বাণিজ্যিক জাহাজে বেশ কয়েকটি হামলা ও আটকের ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ধারাবাহিকভাবে ইরানকে দায়ী করে আসছে।
যদিও তেহরান বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে নিজেদের জলসীমার সার্বভৌমিক নিরাপত্তা রক্ষার কথা জানিয়ে এসেছে। ফিলিপাইন সফরের ঠিক আগে মার্কো রুবিওর এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার দিকেও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
আল জাজিরার সূত্রমতে, ওয়াশিংটন এখন মিত্রদের নিয়ে একটি সম্মিলিত নৌ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে ইরানের যেকোনো একতরফা আধিপত্য বিস্তার বা অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক হস্তক্ষেপ সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়।