মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিয়ে শীর্ষ রাব্বির মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিয়ে শীর্ষ রাব্বির মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন নেতানিয়াহু
ছবি : Collected

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদি রাজনৈতিক দল ‘ডেগেল হাতোরাহ’-এর শীর্ষ আধ্যাত্মিক নেতা রাব্বি দভ ল্যান্ডোর সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সেনাবাহিনীতে কর্মরত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিয়ে করা ওই রাব্বির বিতর্কিত বক্তব্যের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাষ্ট্রীয়ভাবে এর তীব্র সমালোচনা ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাব্বি দভ ল্যান্ডো তার এক বক্তৃতায় অভিযোগ করেছিলেন যে, দেশের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা মূলত হত্যাযজ্ঞে উসকানি দিয়ে থাকে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও জাতীয় নিরাপত্তার এই অত্যন্ত নাজুক সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক বাহিনীকে নিয়ে এমন নেতিবাচক মন্তব্য ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক মহলে এক নজিরবিহীন অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে, যা দেশটির যুদ্ধকালীন অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ও কড়া বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। ওই বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কট্টরপন্থী এই ধর্মীয় নেতার বক্তব্যকে চরম ‘বিস্ময়কর’ এবং অনভিপ্রেত বলে অভিহিত করেন।

 

নেতানিয়াহু অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান কঠিন সময়ে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং কট্টর অর্থোডক্স বা হারেদি-উভয় মতাদর্শের সৈনিকরাই ইসরায়েল রাষ্ট্র, এর সাধারণ নাগরিক এবং সমগ্র জাতিকে সম্ভাব্য সব ধরনের বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের ঘরবাড়ি, নিয়মিত কর্মক্ষেত্র ও প্রিয় পরিবার পরিজনকে ফেলে রেখে রণক্ষেত্রে চলে আসেন।

 

তারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে সম্মুখ সমরে নিজেদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে বিপন্ন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরও গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, বর্ণ, ধর্ম ও গোত্র নির্বিশেষে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত এই অসমসাহসী সৈন্যরা দেশের জনসাধারণের সকল অংশ এবং অবশ্যই তোরাহ বা ধর্মীয় জগতের কাছ থেকে গভীর প্রশংসা, আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং নিরঙ্কুশ পূর্ণ সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।

 

তাদের আত্মত্যাগকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। এর আগে গত রোববার এক ধর্মীয় আলোচনায় রাব্বি দভ ল্যান্ডো দেশটির সামরিক বাহিনীর বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে এক চরম বিতর্কিত প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

 

তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, রাষ্ট্র যদি কেবল তার নিজস্ব রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক সম্মানের স্বার্থে সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায় এবং তার ফলে সেখানে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে, তবে সেটিকে কোনোভাবেই বৈধ বলা চলে না। তার দৃষ্টিতে এটি মূলত এক ধরনের হত্যাকাণ্ড।

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই সৈন্যরা কেবল আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করে না, বরং রাষ্ট্রের তথাকথিত মর্যাদা রক্ষার জন্যও যুদ্ধ করে, যা প্রকারান্তরে সমাজে হত্যাযজ্ঞে প্ররোচনা দেওয়ার শামিল।

 

রাব্বি দভ ল্যান্ডোর এই বিস্ফোরক মন্তব্য এমন একটি সময়ে সামনে এলো, যখন ইসরায়েলে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা হারেদি বা কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।

 

ঐতিহ্যগতভাবেই এই সম্প্রদায়ের তরুণরা সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছিলেন, যা নিয়ে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান গাজা ও লেবানন সংকটের কারণে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে যখন তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে, তখন হারেদি সম্প্রদায়ের ওপর এই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আরোপের বিষয়টি নেতানিয়াহুর কোয়ালিশন সরকারের স্থায়িত্বকেই চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

এই স্পর্শকাতর সময়ে ধর্মীয় নেতার এহেন বক্তব্য ইসরায়েলি সমাজের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ও সামরিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ বিরোধকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।

 

- আল জাজিরা