মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গঠনে ইসরায়েলের ৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গঠনে ইসরায়েলের ৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সুকৌশলে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত গোপন প্রচারণা চালাচ্ছে ইসরায়েল।

 

এই কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে ৪৫ মিলিয়ন বা সাড়ে চার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি তথ্যযুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভিন্ন একটি দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে জনমত নিয়ন্ত্রণের এই অভিনব কৌশল আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই বিস্তৃত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে লাখ লাখ স্বয়ংক্রিয় খুদে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এসব বার্তায় প্রেরক হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত ও সাধারণ ইংরেজি নাম যেমন-‘এমা’, ‘সারা’ বা ‘জন’ ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

এর মূল কারণ হলো, প্রাপকদের মনে যেন বার্তা প্রেরকের পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহের উদ্রেক না হয়। এই বার্তাগুলো পাঠানো হচ্ছে ‘ফ্রেন্ডস ফর পিস’ নামের একটি তথাকথিত শান্তিপ্রিয় সংগঠনের পরিচয়ে।

 

তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা খুঁজে বের করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে এই নামে নিবন্ধিত কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা বৈধ কোম্পানির আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। এই সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে পাঠানো বার্তাগুলোতে প্রাপকদের কাছে অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্ন রাখা হচ্ছে।

 

উদাহরণস্বরূপ, ‘ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শান্তি আলোচনা বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তায় কী ধরনের নেতিবাচক বা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন?’-এমন সব মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সুকৌশলে মার্কিন মুলুকে ইসরায়েলপন্থি একটি জোরালো জনমত গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

এই বিপুল ব্যয়ের প্রচারণার আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত দিকটিও অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং চমকপ্রদ। সংবাদপত্রটির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই পুরো কার্যক্রমটি ৪৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি বৃহৎ চুক্তির অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

 

এই বিশাল প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনি প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেল, যিনি এর আগে তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণে তার দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বার্তা ছড়ানোর মূল দায়িত্বে থাকা ‘স্পার্কফায়ার’ নামের একটি আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গত মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্তই এই কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রায় সাড়ে ছয় মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

শুধু সাধারণ নাগরিকদের খুদে বার্তা পাঠানোই নয়, পারস্কেলের নেতৃত্বাধীন দল ইসরায়েলের পক্ষে জনমত ভারী করতে বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং প্রচুর পরিমাণে অনলাইন কনটেন্টও তৈরি করছে।

 

এর মূল লক্ষ্য হলো চ্যাটজিপিটি এবং ক্লদের মতো জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করা বা ম্যানিপুলেট করা, যাতে এসব প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েল সম্পর্কে কোনো তথ্য খুঁজলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা কেবল ইতিবাচক ও ইসরায়েলপন্থি উত্তরই পান।

 

জনমত গঠনের এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রচেষ্টা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এর আগে গত বছর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’র আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, ২০২৬ সালের বাজেটে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনুকূল ‘জনমত গঠন’-এর মতো কার্যক্রমের জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের এক বিশাল তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, বর্তমান এই ৪৫ মিলিয়ন ডলারের প্রচারণাটি ওই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি ক্ষুদ্র অংশ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এই কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য এরই মধ্যে অন্তত ছয়টি জনসংযোগ ও লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

পাশাপাশি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাজ করার জন্য প্রায় তিন ডজন ব্যক্তি বিদেশি এজেন্ট হিসেবে মার্কিন আইন অনুযায়ী নিজেদের নাম নিবন্ধন করেছেন। এই প্রচারণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় রক্ষণশীল সম্প্রচারমাধ্যম সালেম মিডিয়ার মাধ্যমেও পাঁচ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে।

 

যদিও সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে দাবি করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বা মতবাদ প্রচারের জন্য তাদের নিজস্ব উপস্থাপকদের কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করেনি।

 

বিদেশি রাষ্ট্রের দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করার এই চেষ্টার বিষয়টি নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। গত বুধবার জনপ্রিয় মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।

 

তিনি বলেন, ইসরায়েল সরকারের কিছু অতি-উৎসাহী সদস্য ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতকে প্রভাবিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

 

এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পক্ষ থেকে এই গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও, তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের জবাব দেওয়া হয়নি। নীরবতা পালনের এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে এবং কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

 

- আরটি