যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সোমবার রাতের অন্ধকারে শুরু হওয়া এই তীব্র সামরিক অভিযানটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় নিশ্চিত করেছে।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের দাবি, হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের যে সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তা চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়াই তাদের এই ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের প্রধান ও অন্যতম কৌশলগত উদ্দেশ্য।
চলমান এই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল সূত্রপাত ঘটে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে এক আকস্মিক ও বড় ধরনের সামরিক হামলা পরিচালনা করে।
মিত্রশক্তির সেই আগ্রাসনের কড়া ও তাৎক্ষণিক জবাবে ইরানও বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ড এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
দুই পক্ষের এই প্রতিশোধমূলক পাল্টাপাল্টি আক্রমণের জেরে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি সর্বাত্মক ও প্রলয়ংকরী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় এরই মধ্যে ইরান, লেবাননসহ সংঘাতপূর্ণ আশপাশের অঞ্চলগুলোতে হাজার হাজার সাধারণ ও নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখ লাখ অসহায় মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।
যুদ্ধের এই ভয়াবহ দামামা ও মানবিক বিপর্যয়ের ঢেউ কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর অত্যন্ত নেতিবাচক ও গভীর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, ইরানের পাল্টা হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ায় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট নিহত সেনাসদস্যের সংখ্যা ১৭ জনে পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে ও বিপজ্জনক রূপ দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দেশের এই নিহত সেনাদের রক্তের চরম বদলা নেওয়ার জন্য অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এমনকি গত সপ্তাহে তিনি প্রকাশ্যেই এমন এক ভয়ংকর ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিস্থিতি যদি আরও অবনতির দিকে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো, যেমন-বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম সেতুগুলোতেও সরাসরি সামরিক আঘাত হানতে পিছপা হবে না।
এদিকে, ইয়েমেনের মাটি থেকে পরিচালিত ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপের যে আকস্মিক ও দুঃসাহসিক ঘোষণা দিয়েছে, তা এই চলমান সংঘাতকে আরও বহুমাত্রিক ও জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
হুথিদের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের এই বহুমুখী বিস্তারের কারণে বিশ্ববাজারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্রমবর্ধমান ও নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার হুমকিতে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট আসিয়ান।
মঙ্গলবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানভুক্ত ১১টি সদস্য রাষ্ট্র ও তাদের প্রধান অংশীদার দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকে এই উদীয়মান বৈশ্বিক সংকট নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
দীর্ঘ বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা চরম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, সাম্প্রতিক এই সামরিক আগ্রাসন ও সংঘাতের ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং গঠনমূলক আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে এই জটিল সংকট সমাধানের সম্ভাবনাকে দিন দিন আরও ক্ষীণ করে তুলছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল ও উদীয়মান অর্থনীতির এই আসিয়ান অঞ্চলটি তাদের শিল্পের চাকা সচল রাখতে ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বহির্বিশ্ব থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ও যুদ্ধের ডামাডোলের কারণে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা তৈরি হবে, তা দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করার জন্য আসিয়ান দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে দ্রুত একটি যৌথ তেল বণ্টন ব্যবস্থা চালুর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক এই বহুমুখী সংকটের পাশাপাশি আসিয়ান জোটের সামনে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ম্যানিলার এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত চলমান গৃহযুদ্ধ নিয়েও গভীর ও বিশদ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২১ সালে দেশটিতে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার যে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।