ইরানের সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, জর্ডানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আল-রুকবান এলাকায় অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি আবাসিক কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে তারা অতর্কিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এই আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন বলে আইআরজিসির পক্ষ থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এই ঘটনা নতুন করে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের অশনিসংকেত দিচ্ছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও কড়া বিবৃতিতে আইআরজিসি তাদের এই সামরিক পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করে। বিবৃতিতে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ওই অঞ্চলে আগ্রাসনকারী মার্কিন বাহিনীর অন্যায্য উপস্থিতি ও আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে তারা সুনির্দিষ্টভাবে ‘অপারেশন নাসর ২’ শীর্ষক একটি ধারাবাহিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।
আর এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত অভিযানেরই একটি সরাসরি অংশ হিসেবে জর্ডানের আল-রুকবান এলাকার ওই মার্কিন সামরিক আবাসিক কমপ্লেক্সে সর্বাত্মক আঘাত হানা হয়েছে। আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছে যে, তাদের পরিচালিত এই দুঃসাহসিক অভিযান সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এবং আল-রুকবান ঘাঁটিতে বহুসংখ্যক মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে এই চাঞ্চল্যকর দাবির পর এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কিংবা জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি প্রদান করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ওয়াশিংটন ও আম্মানের এই কৌশলগত নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বেশি রহস্যময় ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এই সংঘাতময় পরিস্থিতির শেকড় মূলত লুকিয়ে আছে সাম্প্রতিক অতীতের কিছু জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনার মধ্যে। উল্লেখ্য যে, ইরানের বিতর্কিত পরমাণু প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করলে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।
টানা চল্লিশ দিন ধরে চলা সেই রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে গত ৭ই এপ্রিল তেহরান ও ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের মানুষ যখন কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিল, ঠিক তার দুই মাসেরও বেশি সময় পর একটি গঠনমূলক শান্তি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতার ভিত্তিতে গত ১৭ই জুন বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।
এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শান্তির এই সম্ভাবনা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
গত ৫ই জুলাই সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো ভঙ্গ করে পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন দুটি বৃহৎ তেলের ট্যাংকার বা জাহাজে ড্রোন ব্যবহার করে ভয়াবহ হামলা চালায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর।
আইআরজিসির এই আগ্রাসী পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দার ঝড় ওঠে এবং বহু কাঙ্ক্ষিত শান্তি চুক্তিটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। আরব আমিরাতের ট্যাংকারে চালানো এই হামলার কঠোর ও দাঁতভাঙা জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি।
গত ৭ই জুলাই থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী ও তৎপর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে টানা ও নিরবচ্ছিন্ন বোমা বর্ষণ শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও চুপ করে বসে থাকেনি। তারা তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক প্রাণঘাতী ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি এবং প্রতিশোধমূলক সামরিক সংঘাত এখনো পুরোদমে চলমান রয়েছে, যার ফলে পুরো অঞ্চল এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর অবস্থান করছে।
জর্ডানের আল-রুকবান ঘাঁটিতে আইআরজিসির এই সর্বশেষ হামলা ও সেনা নিহতের দাবি যদি সত্যি বলে প্রমাণিত হয়, তবে তা চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।