মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবকে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে, কড়া হুঁশিয়ারি ইয়েমেনের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

সৌদি আরবকে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে, কড়া হুঁশিয়ারি ইয়েমেনের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাপ্রবাহে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের ওপর থেকে দীর্ঘস্থায়ী ও অমানবিক অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা না হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে চরম ও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইয়েমেন।

 

মঙ্গলবার ভোরে ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া, সুস্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিতে এই চরম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে ইয়েমেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই।

 

বিবৃতিতে ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেছে যে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বা অধীনস্থ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এক ধরনের নির্লজ্জ আধিপত্যবাদী আচরণ করে আসছে।

 

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে রিয়াদ এমনভাবে আচরণ করছে, যেন ইয়েমেনের অবরুদ্ধ বন্দরগুলোতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যবাহী জাহাজগুলোকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া তাদের কোনো বিশেষ দয়া বা করুণা।

 

অথচ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের বেঁচে থাকার জন্য এই ন্যূনতম মানবিক অধিকারগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ইয়েমেনের পক্ষ থেকে রিয়াদের এই ধরনের আধিপত্যকামী, অহংকারী ও অবমাননাকর মানসিকতার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।

 

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অসম, অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১২ বছরে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের নির্বিচার বিমান হামলায় ইয়েমেনের অন্তত দশ হাজার নিরীহ নাগরিকের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

 

ইয়েমেনের আপামর জনগণ তাদের স্বজন হারানোর এই অসীম বেদনা এবং অন্যায়ভাবে ঝরে যাওয়া দশ হাজার মানুষের রক্ত কখনোই বিস্মৃত হবে না। ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুতর অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক যুগে ইয়েমেনের আকাশসীমায় প্রায় আড়াই লাখ বার ভয়াবহ সামরিক বিমান হামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যা এই অন্যায্য সংঘাতের প্রকৃত ও ভয়াবহ চিত্র বিশ্বের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

 

এত বিশালসংখ্যক প্রাণঘাতী হামলার পরও সৌদি আরব নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও দায় আড়াল করতে তাদের মিত্র রাষ্ট্র এবং ভাড়াটে সশস্ত্র বাহিনীর পেছনে লুকানোর এক কাপুরুষোচিত ও ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে ওই বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

 

পরিস্থিতি যদি অবিলম্বে পরিবর্তন না হয় এবং অবরুদ্ধ অবস্থার অবসান না ঘটে, তবে ইয়েমেন যে কোনোভাবেই আর নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না, তা অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে যে, রিয়াদকে অবশ্যই ইয়েমেনের বিরুদ্ধে চলমান সমস্ত সামরিক আগ্রাসন এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবরোধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, ভবিষ্যতে এর চেয়েও চরম ও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করার জন্য রিয়াদকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

সতর্কবার্তায় সরাসরি পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে যে, সৌদি আরবের নীতিনির্ধারকদের খুব ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত যে, ইয়েমেনের অবরুদ্ধ সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আজ যে করুণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অচলাবস্থা বিরাজ করছে, রিয়াদের বিলাসবহুল বিমানবন্দরের পরিস্থিতিও ঠিক একই রকম হওয়া উচিত।

 

ঠিক একইভাবে, ইয়েমেনের প্রধান সমুদ্রবন্দর হোদাইদাহ আজ যে চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ইয়ানবু, জিজান এবং অন্যান্য লাভজনক বন্দরগুলোর অবস্থাও হোদাইদাহ বন্দরের মতো হওয়া উচিত।

 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইয়েমেন মূলত 'চোখের বদলে চোখ' নীতির ভিত্তিতে একটি সমকক্ষ ও ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাতের অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত প্রদান করেছে। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের একটি যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথও বাতলে দেওয়া হয়েছে এই সময়োপযোগী বিবৃতিতে।

 

ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রিয়াদের উদ্দেশে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি পরামর্শ দিয়ে বলেছে যে, অতীতের ভুল পদক্ষেপগুলো জিদ করে আঁকড়ে ধরে রেখে এবং সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখার মাধ্যমে যে বিপুল আর্থিক ও মানবিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, তার চেয়ে বরং সঠিক, যৌক্তিক ও শান্তির পথে ফিরে আসার মূল্য অনেক কম।

 

ইয়েমেনের মূল দাবিগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও আপসহীন। তারা নিজেদের মাতৃভূমির জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, নিরঙ্কুশ জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমস্ত বৈধ অধিকার ফিরে পেতে চায়; এর চেয়ে একবিন্দু বেশিও নয়, আবার কমও নয়।

 

ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী আপামর জনগণ এই মৌলিক ও ন্যায়সংগত অধিকারগুলোর বাইরে অন্য কোনো অপমানজনক আপস বা শর্ত কখনোই মেনে নেবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

পরিশেষে, ইয়েমেনের এই কঠোর সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি নতুন মোড় তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অবরোধ ও সংঘাত শুধু ইয়েমেনের ভেতরেই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার সুযোগ নিয়ে চলা এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইয়েমেন এখন যে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা আগামী দিনগুলোতে রিয়াদ ও সানার মধ্যকার সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটি অন্তত স্পষ্ট যে, ইয়েমেন আর কোনোভাবেই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতে রাজি নয়।

 

- পার্সটুডে