সিআইএর তৈরি ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন ও শীর্ষ সামরিক নেতাদের প্রাণহানি সত্ত্বেও তেহরান সরকারের নতিস্বীকার করার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই গোয়েন্দা পর্যালোচনার তথ্য প্রকাশ করে জানানো হয়, আমেরিকা ও ইরানের বিদ্যমান সংঘাত বর্তমানে এক চরম অনিশ্চিত ও ভয়াবহ কৌশলগত অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে, যেখানে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে আনার মার্কিন প্রচেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হতে চলেছে।
চলমান এই সংঘাতের কৌশলগত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ফেব্রুয়ারি মাসে যৌথভাবে যে সামরিক অভিযানের সূচনা করেছিলেন, তা এখন এক বিপজ্জনক মরণপণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং যুদ্ধের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত নিরসনে বা বিজয় অর্জনে নতুন করে মার্কিন পদাতিক কিংবা স্থলবাহিনী পাঠানোর ঝুঁকি নিলে ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামরিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে দুজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন তাদের আক্রমণের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র টানা দশম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় নজিরবিহীন বোমাবর্ষণ পরিচালনা করেছে।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি ইরান। মার্কিন বিমান হামলার প্রতিরোধে গত সোমবার সকালে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা কুয়েত ও বাহরাইনের আকাশসীমা লক্ষ্য করে একযোগে একাধিক প্রাণঘাতী ড্রোন ও শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের সামরিক বাহিনী, যা পুরো অঞ্চলকে নতুন করে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
একই সাথে সংঘাতের এই উত্তাপ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে। বিশেষ করে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে সামুদ্রিক অবরোধের কঠোর ঘোষণা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সমুদ্রপথ লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মানদাব প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনের এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে বলে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এমন ভয়াবহ ও উত্তপ্ত সামরিক লড়াইয়ের মধ্যেও আড়ালে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের কিছু ক্ষীণ আলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যম এবং কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই নতুন আলোচনার বার্তা আদান-প্রদান করছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন এখনো যেকোনো কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন যে, তেহরানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা সামরিক হার্ডলাইনারদের চরমপন্থী আচরণ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণেই বাধ্য হয়ে মার্কিন বাহিনীকে এই সামরিক হামলা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোয়েন্দা নথিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, মার্কিন হামলায় তাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ও শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কমান্ডারদের হারিয়েও তেহরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নিজেদের টিকিয়ে রাখার অসাধারণ সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ পরিচালক জোনাথন প্যানিকফ এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ প্রদান করে জানান যে, কেবল সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে নমনীয় বা বাধ্য করার যে প্রথাগত ধারণা ওয়াশিংটন এতদিন পোষণ করছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
কারণ এই মুহূর্তে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মূল ও প্রধান অগ্রাধিকার হলো যেকোনো মূল্যে তাদের শাসনব্যবস্থা ও সরকারের স্থায়িত্ব বজায় রাখা। এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী একাংশ এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির হার্ডলাইনারদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তবে অভ্যন্তরীণ সমস্ত দ্বিমত ও দ্বন্দ্ব সরিয়ে রেখে দেশের বর্তমান সংকটাপন্ন মুহূর্তে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং প্রধান কূটনৈতিক আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ জাতীয় ঐক্য ও সামরিক সংহতির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁদের এই কঠোর অবস্থানের কারণে মার্কিন বিমান হামলা বাড়লেও ইরানের নীতিতে কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।