ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ-মহাসচিব আলী বাকেরি কানি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা ও হতাশার সম্মুখীন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে ইরানের সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী ওয়াশিংটনের এই আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী লক্ষ্য কোনোভাবেই বাস্তবে রূপ নিতে দেবে না। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে সামরিক ও কৌশলগত সংঘাতের সূচনা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ইরানের এই কড়া বার্তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রার যোগ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে আয়োজিত এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আলী বাকেরি কানি হরমুজ প্রণালির কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলেন, হরমুজ প্রণালিকে কেবল একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটি এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল, যা বিশ্ববাজারের তেল সরবরাহ, প্রাকৃতিক গ্যাসের অবাধ প্রবাহ, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির মতো অসংখ্য নির্ণায়ক ভূরাজনৈতিক উপাদানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
মূলত এই জলপথটি ইরানের আপামর জনগণের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং ভাগ্য নির্ধারণে এক অসামান্য ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাঁর মতে, সামরিক সংঘাতে ইরানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে ভিন্ন পথে হাঁটছে।
তারা এই প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে ইরানের জাতীয় শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ারটি কেড়ে নিতে চাইছে। তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান অত্যন্ত বিচক্ষণতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও অটল সামরিক দৃঢ়তার সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই হীন ষড়যন্ত্র ও আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা মোকাবিলা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে এই শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে নির্লজ্জভাবে সেই চুক্তির প্রতিশ্রুতি বরখেলাপ করেছে।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সরাসরি সামরিক সংঘাতে নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন মূলত নতুন করে সামরিক চাপ প্রয়োগ ও অব্যাহত হুমকির মাধ্যমে ইরানকে জোরপূর্বক তাদের শর্তানুযায়ী আলোচনার টেবিলে বসাতে চেয়েছিল।
কিন্তু তেহরান কারো রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় শক্তির ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের সেই কূটকৌশল অত্যন্ত সফলভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে। বাকেরি কানির ভাষায়, হরমুজ প্রণালির সুরক্ষা শুধু একটি জলপথ পাহারার বিষয় নয়, এটি ইরানের অবিচ্ছেদ্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন।
তাই দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার এই চরম সংবেদনশীল বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার বা কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শনের কোনো আইনি বা নৈতিক সুযোগ নেই। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক ও তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এই প্রবীণ উপ-মহাসচিব দাবি করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক কৌশলগত সামরিক উদ্যোগগুলো এখন সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও সুযোগ্য নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রাথমিকভাবে এক ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেছিলেন যে, তারা তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ব্যবহার করে এই চলমান সংঘাতকে একটি অত্যন্ত সীমিত ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে আটকে রাখতে সক্ষম হবেন। কিন্তু ইরান অত্যন্ত দূরদর্শী দক্ষতা ও অভাবনীয় সামরিক কৌশলের মাধ্যমে সেই সংকটকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত করেছে।
এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র এখন বাধ্য হয়ে একটি অত্যন্ত দুর্বল ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বুকে নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তি হিসেবে সদম্ভ দাবি করা যুক্তরাষ্ট্র আজ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অদম্য সাহসিকতার সামনে আক্ষরিক অর্থেই এক চরম ও হতাশাজনক অচলাবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়েছে।
পরিশেষে আলী বাকেরি কানি অত্যন্ত জোর দিয়ে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন যে, নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে ইরান তার সামরিক এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার করবে।
হরমুজ প্রণালিকে ইরানের জাতীয় শক্তির এক অবিচ্ছেদ্য ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি দেশবাসী ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন যে, এই জলপথ কখনোই বিদেশি শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে আধুনিক রণকৌশলে।
তিনি তাঁর দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিপুল সামরিক ক্ষমতা ও অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে যতই অহংকার ও বড়াই করুক না কেন, ইরানের বিরুদ্ধে অঘোষিত এই লড়াইয়ে তারা ইতিমধ্যেই চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ঠিক একইভাবে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মার্কিন অপচেষ্টাও অচিরেই সম্পূর্ণভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। ইরান ভবিষ্যতেও তার প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ইস্পাতকঠিন সামরিক দৃঢ়তা দিয়ে শত্রুর যেকোনো অসৎ লক্ষ্য অর্জনের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেবে এবং হরমুজ প্রণালি এই সমগ্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে তার গৌরবময় ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।