বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বি-১ বোমারু বিমানের হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

ইরানের সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বি-১ বোমারু বিমানের হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও একবার চরম উত্তেজনার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানতে ভয়াবহ শক্তিসম্পন্ন বি-১ দূরপাল্লার বোমারু বিমান ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।

 

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক বারো দিন পর প্রথমবারের মতো আকাশপথে এত বড় পরিসরে শক্তি প্রদর্শন করল যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক ও ধ্বংসাত্মক বোমারু বিমানগুলো যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে উড়ে এসে ইরানের অভ্যন্তরে এই অভিযান পরিচালনা করেছে।

 

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমানগুলো একসঙ্গে অন্তত চব্বিশটি বিপুল ওজনের প্রাণঘাতী বোমা অথবা অসংখ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে, যা যেকোনো লক্ষ্যবস্তুকে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিতে সক্ষম।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ইরানের বেশ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

 

এই হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক পরিচালনা কেন্দ্র, বিমান রাখার সুরক্ষিত হ্যাঙ্গার, মানববিহীন ড্রোন মজুত করার গোপন আস্তানা এবং সামরিক রসদ সরবরাহের মূল অবকাঠামো ধ্বংস করা।

 

সেন্টকমের দাবি, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান যে ক্রমাগত হুমকি সৃষ্টি করে আসছিল, তা চিরতরে নির্মূল করার লক্ষ্যেই এই সুনির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, এই সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়েও চলছে তীব্র বাগযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মহড়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

 

তিনি এক বিবৃতিতে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে যদি আর কোনো বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সামান্যতম হামলা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

 

সেক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে দেশের প্রধান সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পাল্টা ধ্বংসাত্মক আঘাত হানবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ট্রাম্পের এই কড়া বার্তার পর ইরানও নীরব বসে থাকেনি।

 

তেহরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ভূখণ্ডে আরও কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সরাসরি ও ভয়াবহ হামলা চালাবে।

 

দুই পরাশক্তির এমন পাল্টাপাল্টি এবং অনমনীয় অবস্থান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই উত্তেজনার আঁচ শুধু হরমুজ প্রণালিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল আরেক জলপথে।

 

এই সংঘাতের রেশ ধরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও নতুন করে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে সর্বাত্মক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর পরই ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি আরবের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজের ওপর সরাসরি হামলা চালানো শুরু করেছে।

 

হুথি বিদ্রোহীদের এই নতুন করে শুরু করা হামলার কারণে লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাব এল-মানদেব প্রণালিতে নতুন করে তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

তবে এমন একটি যুদ্ধংদেহী এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তির একটি ক্ষীণ আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে কূটনৈতিক তৎপরতা। উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বিশ্ববাণিজ্যের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ওমানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক ও গোপন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

 

এক সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন যে, ইরান বারবার চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করার কারণে আলোচনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং তারা এখনো একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

 

তা সত্ত্বেও, তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, তেহরান খুব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোতে রাজি হতে বাধ্য হবে এবং একটি চুক্তিতে উপনীত হবে। আপাতত সমগ্র বিশ্বের নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে, যেখানে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গও উসকে দিতে পারে বড় ধরনের কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ।

 

- এক্সিওস