শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে উত্তাপ

বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন রূপ ধারণ করেছে। ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর টানা ১৩ দিনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এবার এর জবাবে অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের এই সাম্প্রতিক আক্রমণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মুখোমুখি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

 

চলমান এই সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মারাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতির বরাতে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাহরাইন ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইরান এই নতুন হামলা পরিচালনা করেছে।

 

দেশটির আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজে প্রকাশিত সেনাবাহিনীর এক বিশেষ বিবৃতিতে বিস্তারিত উল্লেখ করে বলা হয়, বাহরাইনে অবস্থিত বিখ্যাত শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি সামরিক ড্রোন আঘাত হেনেছে।

 

সেখানে থাকা প্রধান জ্বালানি ট্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির গুদাম এবং মার্কিন সৈন্য ও কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত বাসস্থান প্রাঙ্গণকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই সমন্বিত ড্রোন হামলার ফলে ঘাঁটিটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে ইরানি সূত্র থেকে দাবি করা হয়।

 

একইসঙ্গে, জর্ডানে অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি, যা আল-আজরাক বিমানঘাঁটি নামেও পরিচিত, সেখানেও সফল ড্রোন আক্রমণ চালানো হয়েছে। সামরিক সূত্রে বলা হয়েছে, জর্ডানের উক্ত ঘাঁটির বিমান হ্যাঙ্গার, অত্যাধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং সেনা সদস্যদের আবাসন এলাকাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এই ড্রোনগুলো প্রেরণ করা হয়েছিল।

 

এই কৌশলগত হামলার পর ইরানের সেনাকমান্ড এক কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে। তারা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছে যে, ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কিংবা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের বা তাদের কোনো মিত্রের যেকোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করবে।

 

তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতের জবাবে তারা সমপরিমাণ এবং একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করবে না। ইরানি সামরিক আধিকারিকরা মনে করছেন, নিজেদের আত্মরক্ষা এবং আঞ্চলিক প্রভাব টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ জবাব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বহুজাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সচল রাখা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই সংঘাত মারাত্মক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সামরিক কমান্ড সেন্টার বা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলার খবরের প্রেক্ষাপটে তাদের নিজস্ব সামরিক কর্মকাণ্ড ও অভিযানের তথ্য তুলে ধরেছে।

 

সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের অভ্যন্তরে তাদের প্রধান সামরিক নির্দেশক কেন্দ্র, দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন ও প্রযুক্তির সুবিশাল মজুত কেন্দ্র, সর্বাধুনিক সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, দীর্ঘ উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামরিক সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে নিখুঁত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের ব্যাপকভিত্তিক সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরানকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির আওতায় আনা এবং অঞ্চলটিতে দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা।

 

বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর যে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও হুমকি তৈরি হচ্ছে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করাও মার্কিন অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বলে বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়েছে।

 

সংঘাতের তীব্রতা কেবল সামরিক ঘাঁটি কিংবা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ইরানের অভ্যন্তরেও তা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের কেশম দ্বীপে বিকট শব্দে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে।

 

পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজ শহরের আকাশে ও মাটিতেও একাধিক বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায় এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের স্থানীয় আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো সূত্রে আরও জানা গেছে, খুজেস্তান প্রদেশের শেষ সীমানায় অবস্থিত আন্দিমেশক এবং ওমিদিয়া শহরেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক স্থান বিধ্বস্ত হয়েছে।

 

উপরন্তু, ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসের একটি জনবহুল আবাসিক এলাকায় সরাসরি মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত দুজন বেসামরিক নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

 

উভয় পক্ষের এই টানা আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক অভূতপূর্ব থমথমে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

 

সামরিক শক্তির এমন উন্মুক্ত ব্যবহার এবং কোনো সমঝোতায় না আসার অবস্থান কেবল অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককেই বিষাক্ত করছে না, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি ও সার্বিক স্থিতিশীলতায় একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ডেকে আনতে পারে। বিশ্বনেতারা পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের আহ্বান জানালেও উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে, যা নিকট ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সঙ্কেত দিচ্ছে।

 

- আল জাজিরা