মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পাঠানো এই সন্ধির প্রস্তাবটি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির মাধ্যমে তেহরানে পৌঁছানো হলেও, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন ঠেকাতে এতে কার্যকর কোনো নিশ্চয়তা না থাকার কারণে ইরান তা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মূলত টানা ১৩ দিন ধরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিধ্বংসী বিমান হামলার পর, ইরান যখন জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে (বিশেষ করে শেখ ঈসা এবং মুয়াফফাক সালতি ঘাঁটিতে) তাদের প্রতিশোধমূলক ড্রোন হামলা পরিচালনা করে, ঠিক তার পরপরই এই যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
ইরানি ও ইরাকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ এবং অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নেতিবাচক ইতিহাস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অন্যতম প্রধান কারণ।
তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এটাই প্রমাণ করে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অংশীদারিত্বের পরিবর্তে কেবল তাৎক্ষণিক কৌশলগত কূটনীতির আশ্রয় নেয়।
উদাহরণস্বরূপ ইরানি কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) শর্তসমূহ তেহরান সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছে-এমন বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
এই ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রতিশ্রুতি মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেজাজ-মর্জির ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ইরানের অভিযোগ, তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে দেওয়া মার্কিন প্রতিশ্রুতিগুলো বারবার অযৌক্তিকভাবে বিলম্বিত করা হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে সীমিত করা হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল দিয়ে সেগুলোকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত ওয়াশিংটনের এক ধরনের "দ্বিমুখী কৌশল", যেখানে তারা একদিকে বহির্বিশ্বকে দেখানোর জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা বলে এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সমান্তরালভাবে অব্যাহত রাখে।
তাই ইরানি নেতাদের সুস্পষ্ট অবস্থান হলো, এখন আর কেবল ফাঁকা কূটনৈতিক আশ্বাসে কাজ হবে না, বরং বাস্তব, দৃশ্যমান ও আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় আস্থা অর্জন করতে হবে।
যুদ্ধবিরতির এই বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে সম্প্রতি তেহরান সফর করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান পারমাণবিক আলোচক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাকের কলিবফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, এই মুহূর্তে মূল সংকট নিছক বার্তা আদান-প্রদান নিয়ে নয়। তার দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, "সমস্যা বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। মূল সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক, লোভী এবং আধিপত্যবাদী।"
কূটনৈতিক এই প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এমন এক চরম সংবেদনশীল সময়ে ঘটল, যখন উভয় দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এক অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের রেলপথ, বিমানবন্দর, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন জাতীয় অবকাঠামোতে ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরানও নিষ্ক্রিয় থাকেনি; তারা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও নিখুঁত ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তেহরান বারবার এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সামরিক ঘাঁটি থেকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হামলা পরিচালনা করা হয়, আন্তর্জাতিক সংঘাতের নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো ইরানের পাল্টা হামলার সম্পূর্ণ বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই বিবেচিত হবে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি চরমপন্থী হয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোতে হামলার হুমকি সত্যিই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন, তবে সম্ভাব্য এক বৃহত্তর ও সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
তারা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পরিস্থিতি যদি আরও উত্তপ্ত করা হয়, তবে ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়া সম্প্রসারিত করতে বাধ্য হবে। এর মধ্যে ইসরায়েলের তেল আবিবে সরাসরি হামলা চালানো এবং ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করে লোহিত সাগরকে আন্তর্জাতিক নৌপথের সঙ্গে সংযুক্তকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'বাব আল-মান্দাব' প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে বৃহস্পতিবার রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক আজাদি স্কয়ারে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এক বিশাল গণসমাবেশে মিলিত হয়ে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
দেশপ্রেম ও প্রতিরোধের প্রবল চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই সমাবেশে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী একটি সামরিক যান প্রদর্শন করা হয়। এই সামরিক প্রদর্শনীটিকে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরানের অনড় অবস্থান, জাতীয় ঐক্য এবং চূড়ান্ত সামরিক প্রস্তুতির এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবেই আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।