ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং অস্ট্রিয়ার স্বনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেল ‘ওআরএফ’-কে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে ইসমাইল বাকায়ি এই প্রাসঙ্গিক মন্তব্যগুলো করেন।
তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক কোনো দীর্ঘ, জটিল বা অস্পষ্ট আইনি দলিল ছিল না; বরং এটি ছিল মাত্র চৌদ্দ দফার একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে প্রত্যাশা করেছিল যে, অন্তত এবারের চুক্তিতে ওয়াশিংটন তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। কিন্তু চরম হতাশার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি ধারা অত্যন্ত প্রকাশ্যভাবে এবং গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গ টেনে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওই আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তেহরান তাদের সব ধরনের আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে পালন করেছে।
প্রণালির বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য তিনি সরাসরি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিকেই দায়ী করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার উদাত্ত আহ্বান, অন্যদের ভুল ও আগ্রাসী পদক্ষেপের জন্য যেন অযৌক্তিকভাবে ইরানকে দোষারোপ করা না হয়।
চরম বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর আছে কি না, এমন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এখনও নির্দিষ্ট কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয় বার্তা বিনিময় অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এই সংকট নিরসনে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছেন। তবে বাকায়ি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বর্তমানের এই চরম সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তেহরানের প্রধান ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো নিজেদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের হাত থেকে ইরানের সাধারণ নাগরিকদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যেহেতু ইরান বর্তমানে অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক হামলা ও বোমাবর্ষণের সরাসরি হুমকির মুখে রয়েছে, তাই রাষ্ট্রের সার্বিক মনোযোগ এখন কেবল জাতীয় প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেই নিবদ্ধ বলে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা ইরানের অবরুদ্ধ অর্থনৈতিক সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গটিও এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। এ বিষয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করে ইসমাইল বাকায়ি জানান, সম্পদ ছাড়করণের পুরো প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে আছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া আর্থিক সহায়তা বা অনুদান নয়, বরং এগুলো একান্তই ইরানের নিজস্ব ও বৈধ সম্পদ।
এই সম্পদে তেহরানের অবাধ ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা ছিল ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র এই শর্তটিও লঙ্ঘন করেছে।
আঞ্চলিক শান্তির সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান কখনোই গায়ে পড়ে কোনো যুদ্ধ শুরু করতে চায়নি, বরং তারা বারবার অন্যায় আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, গত আট দশক ধরে একটি দখলদার ও গণহত্যাকারী শাসকগোষ্ঠী, অর্থাৎ ইসরায়েল, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর যে ধারাবাহিক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে, তাদের সেই ধ্বংসাত্মক উপস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
পরিশেষে, মানবাধিকার প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর দ্বিমুখী আচরণের অত্যন্ত তীব্র ও কড়া সমালোচনা করেন এই কূটনীতিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বড় বড় নৈতিক বক্তৃতা প্রদান করবে, অথচ অন্যদিকে অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে চলা নির্মম গণহত্যার বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করবে-এমনটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মিনাব ও লামার্দ-এর মতো শহরগুলোতে ইরানি শিশু এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হত্যার ঘটনায় পশ্চিমাদের নীরবতার বিষয়টিকে তিনি তাদের চরম কপটতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।