মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হুঁশিয়ারি নাফতালি বেনেতের

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে কাতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'শত্রু রাষ্ট্র' ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে কাতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'শত্রু রাষ্ট্র' ঘোষণা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই কাতারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত।

 

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আইএনএসএস ন্যাশনাল সিকিউরিটি কনফারেন্স বা জাতীয় নিরাপত্তা সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আগামী দিনে তিনি যদি পুনরায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন, তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ কাতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি 'শত্রু রাষ্ট্র' হিসেবে ঘোষণা করবেন।

 

'বেয়াচাদ' বা টুগেদার পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেত তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত কাতারের বৈশ্বিক অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, কাতার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন করছে এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের জোরদার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বেনেতের এই মন্তব্যকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উসকানিমূলক বার্তা হিসেবেই বিশ্লেষণ করছে।

 

সম্মেলনে উপস্থিত নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরতে গিয়ে বেনেত কাতারকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তিনি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে তার প্রথম দিকের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হবে কাতারকে ইসরায়েলের জন্য একটি চরম শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা।

 

কাতারকে একটি 'ক্যানসার' বা মরণব্যাধির সাথে তুলনা করে এই কট্টরপন্থী ইসরায়েলি নেতা দাবি করেন, এই ব্যাধি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ধীরে ধীরে পশ্চিমা বিশ্ব এবং এমনকি খোদ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত তার বিষাক্ত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

তার মতে, কাতারের এই ধরনের সমস্ত কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পরিপন্থী এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের টিকে থাকার ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অভিযোগ করেন যে, কাতারের মূল ও চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলা বা ধ্বংস করা।

 

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সাথে কাতারের রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিকে বেনেত কেবল সাধারণ কূটনৈতিক বা আর্থিক সহায়তার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করেন না।

 

গত বছরের ৭ অক্টোবরের নজিরবিহীন ও রক্তক্ষয়ী হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হামাসের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় ও প্রধান অর্থায়নকারী দেশ হিসেবে কাতারের হাত ইসরায়েলি নিরীহ নাগরিকদের রক্তে রঞ্জিত।

 

তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে উল্লেখ করেন, ওই কালো দিনে যে সমস্ত নিরপরাধ ইসরায়েলি নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও অপহরণের মতো চরম নির্মমতার শিকার হতে হয়েছিল, তার পেছনে কাতারের এই আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

 

বেনেতের এই ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দেয় যে, তিনি এবং তার দল ভবিষ্যতে কাতারের বিরুদ্ধে চরম কঠোর নীতি গ্রহণে বিন্দুমাত্র পিছপা হবেন না। শুধু সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন নয়, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলকে একটি দুর্বল ও কোণঠাসা রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে কাতার বহু বছর ধরে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিস্তৃত প্রভাব বিস্তারের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে বলেও বেনেত অভিযোগ করেন।

 

এই বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তিনি বিশেষভাবে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'আল জাজিরা' মিডিয়া নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করেন। বেনেতের দাবি, ইসরায়েলকে ধ্বংস করার বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখেই কাতার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ধরনের একটি বিশাল জনসংযোগ ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

 

তার মতে, অত্যন্ত সূক্ষ্ম, সুপরিকল্পিত এবং পেশাদারিত্বের আড়ালে কাতার আল জাজিরার মতো একটি ইহুদি-বিরোধী গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও তাতে বিপুল অর্থায়ন করে যাচ্ছে, যার মূল কাজই হলো হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তাগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উসকে দেওয়া।

 

নিজের এই দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের শেষাংশে নাফতালি বেনেত পুরো পরিস্থিতিকে ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সাথে সরাসরি যুক্ত করেন। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, ইসরায়েলের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ও নজিরবিহীন হামলার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানের জন্য যদি একটি অত্যন্ত প্রাথমিক ও মৌলিক রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনও গঠন করা হতো, তবে সেই কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান একটি দিক হতো এই হামলায় কাতারের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সেরকম কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হলে তাদের প্রাথমিক ও অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্তগুলোর একটি হতো এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া যে-কাতার মূলত একটি কট্টর শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র এবং এর নীতিনির্ধারক ও নেতারা যেকোনো উপায়ে ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর।

 

- পার্সটুডে