মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সামরিক হামলা নয়

কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাতেই ইরানকে কাবু করার নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম

কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাতেই ইরানকে কাবু করার নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনে এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত কৌশল। সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে এখন অর্থনৈতিক হাতিয়ারকেই বেশি কার্যকর বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

 

ঊর্ধ্বতন মার্কিন প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গভীর মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই ধারণা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে যে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক চাপ এবং বহুমুখী আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির ওপর যেকোনো ধরনের বোমাবর্ষণ বা সরাসরি সামরিক অভিযানের চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

 

টানা তেরো দিন ধরে চলা তীব্র সামরিক হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত সেই আক্রমণাত্মক অবস্থান স্থগিত রাখলেও, সংঘাতের মূল ক্ষেত্র এখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে।

 

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে আটকে থাকা বিশাল অঙ্কের অর্থ ছাড় এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলো।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে এই অভাবনীয় আর্থিক অবরোধ তেহরানের নীতিনির্ধারকদের অনেক বেশি চাপের মুখে ফেলেছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রশমনে এবং একটি সম্ভাব্য সমাধানে পৌঁছাতে আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ প্রশমনে ওমান, কাতার এবং পাকিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নিবিড় মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর আলোচনা চলমান রয়েছে।

 

এই বহুপাক্ষিক আলোচনার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। প্রস্তাব করা হয়েছে যে, এই অত্যন্ত সংবেদনশীল নৌপথের ব্যবস্থাপনায় ইরান এবং ওমানকে যৌথভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করা হতে পারে, যা ঐ অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অন্যদিকে, তেহরানের অবস্থানও বেশ অনড়।

 

তাদের পক্ষ থেকে নিজেদের জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মার্কিন অর্থ দপ্তরের আরোপিত যাবতীয় একতরফা বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

 

একইসঙ্গে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে সকল প্রকার অবরোধ শর্তহীনভাবে তুলে নেওয়ার বিষয়ে তেহরান অবিচল রয়েছে।

 

মার্কিন অর্থ দপ্তর বা ট্রেজারি বিভাগের অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ব্যাপক ও দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

 

মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্টের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে নেওয়া এই কঠোর আর্থিক চাপের কারণে ইরান বর্তমানে চরম অর্থ সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়।

 

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত অতি সাম্প্রতিক তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই তীব্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় তাদের নিজস্ব ও সমর্থিত যোদ্ধাদের নিয়মিত বেতনভাতা পর্যন্ত যথাসময়ে পরিশোধ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি, দেশটির অভ্যন্তরে সাধারণ ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের মজুতেও অপ্রত্যাশিত ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরানের বর্তমান প্রশাসন এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেয়ে মার্কিন অর্থ দপ্তরের এই নীরব অথচ প্রাণঘাতী আর্থিক পদক্ষেপগুলোকেই অস্তিত্বের জন্য বেশি হুমকিস্বরূপ মনে করছে।

 

তবে ওয়াশিংটনের এই সর্বাত্মক অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবে কতটা সফল ও ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতি বিষয়ক অনেক প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ। ওবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজার্সের শীর্ষ বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসন এ প্রসঙ্গে একটি ভিন্ন ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন।

 

তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল শতভাগ কার্যকর নাও হতে পারে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বিশ্ববাজারে ইরানের জ্বালানি তেলের অব্যাহত চাহিদার কথা উল্লেখ করেছেন।

 

তিনি তথ্যপ্রমাণসহ উল্লেখ করেন যে, চলতি বছরের কেবল প্রথমার্ধেই বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল রপ্তানি করে ইরান প্রায় তেইশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বিপুল অর্থ আয় করেছে।

 

এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আয় তাদের বর্তমান কঠিন অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে একটি বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। ফলে, কেবলমাত্র আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দিয়ে ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু বা দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে একটি বড় ধরনের যৌক্তিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

 

এই সার্বিক ও জটিল পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্যালয় হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক অবস্থানও বেশ স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সংবাদমাধ্যমের সামনে দেওয়া এক বিস্তারিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো সংঘাত এড়াতে সবসময়ই একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষপাতী।

 

প্রশাসন বিশ্বাস করে যে, আলোচনার মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন সম্ভব। তবে তিনি কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসবাদে মদদ জোগানোর নীতি অব্যাহত রাখে, তবে ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক পদক্ষেপসহ সব ধরনের কঠোর বিকল্প পথই খোলা রাখা হবে।

 

অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে থাকা গোলাবারুদ ও সমরাস্ত্রের মজুতের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে কিছুটা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।

 

তা সত্ত্বেও, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং আশ্বস্ত করেছেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ কিংবা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি-উভয় ক্ষেত্রেই জয়লাভ করার মতো চূড়ান্ত সক্ষমতা ও নেতৃত্বদানকারী প্রজ্ঞা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণভাবে রয়েছে।

 

- এক্সিওস