আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জাহাজে হামলার পর বৈশ্বিক তেল পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে যখন পুরো বিশ্ব চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ্যে এলো।
ভৌগোলিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান বৈরী সম্পর্ক আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে পূর্বনির্ধারিত একটি সরকারি সফরে যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এ উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কিংবা আর্থিক বোঝা না চাপিয়ে তেহরানকে তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনার এটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পথ।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করা এবং সমুদ্রপথে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ চালানোর যে পরিণতি হতে পারে, তা পোহাতে বাধ্য করাতেই তেহরানের নিজস্ব বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কেটে নেওয়া হবে।
এটি কেবল একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কঠোর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও পরিগণিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সমুদ্রপথগুলোতে বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের সিংহভাগ পরিচালিত হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজে একাধিক আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই পথে চরম আতঙ্ক ও স্থবিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
উক্ত সশস্ত্র হামলাগুলোর পর অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক স্তরের উদ্বেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের মতে, এই হামলাগুলোর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যেমন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদও বিনষ্ট হয়েছে।
তাই এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সার্বিক দায়ভার ইরানের ওপরই চাপাতে চায় ওয়াশিংটন। এই বিশেষ অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সম্ভাব্য মেরামত ব্যয়, বিনষ্ট পণ্যের প্রকৃত আর্থিক মান এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্রদের ওপর এর সামগ্রিক ক্ষতিকর প্রভাব নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করছে।
ওয়াশিংটনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন অর্থ সচিব বা ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট গত জুন মাস থেকেই অত্যন্ত গোপনে ও গুরুত্বের সাথে এই জটিল আইনি ও অর্থনৈতিক প্রস্তাবটির নীতিগত খসড়া তৈরিতে কাজ করে আসছিলেন।
মূলত ক্ষতিগ্রস্তপক্ষকে চিহ্নিত করে তাদের দাবীকৃত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ও তা প্রদানের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি চূড়ান্ত করার কাজ পরিচালনা করছে ট্রেজারি বিভাগ। মার্কিন সরকারের এই কড়া পদক্ষেপে দেশটির ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই চরম পদক্ষেপকে তাঁর সমর্থক ও নীতি নির্ধারকরা একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাদের মতে, এটি কোনো নিরপরাধ মার্কিন নাগরিকের অর্থ ব্যয় না করে বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি চরমপন্থী রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি যথাযথ দৃষ্টান্ত।
তবে অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের আশঙ্কা, বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ এভাবে ব্যবহার করা হলে ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তেহরানের বাজেয়াপ্ত অর্থ অন্যায়ভাবে স্পর্শ বা ব্যবহার করা হলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
তবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এই বিপুল তহবিলের আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা বা সম্ভাব্য কঠোর কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মারপ্যাঁচে ট্রাম্প প্রশাসনের এই রূপরেখাটি একটি গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন অর্থ বিভাগ প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করলেও তেহরানের প্রতিক্রিয়া এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে এর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ধাক্কা কীভাবে সামলানো হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
যদি শেষ পর্যন্ত তেহরানের এই জব্দকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি ক্ষতিপূরণ বাবদ হস্তান্তর করা শুরু হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান চরম ভূ-রাজনৈতিক সংকটে এক ভয়াবহ নতুন উত্তাপ যোগ করবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।