মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতার অভিযোগ

ইরানে প্রকাশ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

ইরানে প্রকাশ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর!
ছবি : Collected

ইরানে গত বছরের শেষের দিকে সূত্রপাত হওয়া নজিরবিহীন সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে অংশ নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর, সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে প্রকাশ্যে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড চরম কঠোরতার সাথে কার্যকর করা হয়েছে।

 

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোরের আলো ফোটার পরপরই দেশটির ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরী ইসফাহানের একটি জনাকীর্ণ চত্বরে ফাঁসি দেওয়ার মাধ্যমে এই দণ্ড চূড়ান্তভাবে বলবৎ করে স্থানীয় প্রশাসন।

 

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি ন্যায্যতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ ও বৈশ্বিক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বনামধন্য ও নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ)-এর প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই নাগরিক হলেন আব্দুলফজল সিপাহী বাদজানি এবং আমিরহোসেন সাফারি হোসেইনাবাদী।

 

ইসফাহান শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ‘আলি খানি স্কয়ারে’ সর্বসাধারণের উপস্থিতিতে তাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়। গত বছরের শেষ ভাগে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী নজিরবিহীন বিক্ষোভের সূত্রে পুরো ইরানজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক যে তীব্র অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, তা দমনে তেহরানের কঠোর প্রশাসনিক ও বিচারিক কৌশলের অংশ হিসেবেই এই প্রকাশ্যে সাজা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, গত বছরের শেষাংশে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক ক্ষোভের বহির্প্রকাশ হিসেবে সাধারণ জনগণের এই আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে এই সামাজিক আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের সাত ও আট তারিখে এক চরম উত্তেজনাকর ও সহিংস রূপ পরিগ্রহ করে।

 

ওই দুই দিনে দেশটির বিভিন্ন শহরের রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী অভূতপূর্ব কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাজপথ থেকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার পর পুরো দেশজুড়ে সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে এক চিরুনি অভিযান ও ঢালাও ধরপাকড় কার্যক্রম শুরু হয়।

 

ইসফাহান অঞ্চলের ওই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও বিক্ষোভের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে ইরানি বিচার বিভাগ মোট ১৪ জন আন্দোলনকারীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএনের পর্যালোচনায় জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র, ধারালো সরঞ্জাম ও বোমা ব্যবহার করে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা চালানো এবং হামলায় নিহতদের মরদেহে আগুন দেওয়ার মতো অত্যন্ত মারাত্মক ও নজিরবিহীন কিছু ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল ইরানের বিচার বিষয়ক কর্তৃপক্ষ।

 

তবে এই উচ্চচর্চিত বিচারিক প্রক্রিয়ার সততা, আইনি নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে মারাত্মক সংশয় প্রকাশ করেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ তাদের অনুসন্ধানী নথিতে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে জানিয়েছে যে, আসামি পক্ষকে নিজেদের আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক অধিকার থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

 

বিচার চলাকালীন অভিযুক্তদের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীদের মূল মামলার নথিপত্র, প্রমাণের বিবরণী ও অন্যান্য দাপ্তরিক তথ্যাদিতে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বা পরে রায়ের বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ আইনি অনুলিপি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিবার বা স্বজনদের কাছে হস্তান্তরেও চরম গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে এই ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা মূলত তেহরানের অভ্যন্তরীণ কঠোর নীতি ও শূন্য-সহনশীলতার বারতাই পুনর্ব্যক্ত করে।

 

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই পদক্ষেপটি মূলত দেশের ভেতরে যেকোনো ধরনের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক মতবিরোধ, নাগরিক অসন্তোষ এবং রাজপথের আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করার একটি সুপরিকল্পিত হুশিয়ারি হিসেবে কাজ করছে।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিশ্ব দরবারে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর পর্যবেক্ষণের পথ সুগম হয়েছে এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

- সিএনএন