সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ইরানের নিজস্ব পরিবহন ও কার্গো বিমান ‘সিমোর্গ’ বর্তমানে অপারেশনাল বা উড্ডয়ন সনদ অর্জনের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় কারিগরি মান নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী ইরানি বর্ষ ১৪০৬, অর্থাৎ ইংরেজি ২০২৭ সাল নাগাদ এই অত্যাধুনিক কার্গো বিমানটি বাণিজ্যিকভাবে আকাশে ডানা মেলবে বলে প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেছে দেশটির জাতীয় বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
ইরানের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্সির অ্যারোস্পেস, পরিবহন ও নগর উন্নয়ন সদর দপ্তরের শীর্ষ সচিব শোকরি সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই বিমান প্রকল্পের বর্তমান অবস্থার কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, সিমোর্গ নামের এই অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে গত বছর ধরে সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে আসছে। জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হওয়া রাষ্ট্রীয় চুক্তি অনুযায়ী গবেষণার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমানে বিমানটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আন্তর্জাতিক মানের মান নির্ধারণ, লাইসেন্সিং এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাণিজ্যিক উড্ডয়নের ক্ষেত্রে এই পর্যায়টিকে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে বর্তমানে ইরান এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি এবং দেশটির সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের মধ্যে চমৎকার সমন্বয়ের মাধ্যমে এসটিসি অথবা টিসি সনদ অর্জনের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
বহু দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক বাজার থেকে বিমানের প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রাংশ সরবরাহে তীব্র সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানের বেসামরিক ও সামরিক বিমান শিল্পকে পদে পদে নানাবিধ জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
ঠিক এমন একটি চরম প্রতিকূল প্রেক্ষাপটে সিমোর্গ নামের এই কার্গো বিমান প্রকল্পটিকে কেবল একটি প্রতীকী বা সাধারণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি দেশটির ক্রমবর্ধমান কার্গো পরিবহন এবং আকাশপথে পণ্য সরবরাহের বিশাল বাস্তব চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আধুনিক অ্যারোডাইনামিক্স অনুসরণ করে এই উড়োজাহাজটি মূলত সুপরিচিত ইরান-১৪০ প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত নিখুঁত নকশায় তৈরি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্গো পরিবহন বিমান নির্মাণ করা, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আকাশপথে কার্গো ও এয়ার সাপোর্ট বা পণ্য পরিবহন খাতটি ইরানের সামগ্রিক বিমান শিল্পের প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম উন্নত হলেও এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্র।
এই বিশেষ খাতে নিজেদের দেশীয় সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা গড়ে তোলার মাধ্যমে ইরান মূলত ভবিষ্যতে আরও আধুনিক ও উন্নত প্রজন্মের বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান নির্মাণের একটি শক্তিশালী কারিগরি ভিত্তি তৈরি করছে।
এই জাতীয় মেগা প্রকল্পে ইরানের নিজস্ব জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিমানের অত্যন্ত জটিল বিভিন্ন সাব-সিস্টেম বা অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশ তৈরি, সেগুলোর নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি মান নিশ্চিতকরণ, নথিপত্র চূড়ান্তকরণ এবং লাইসেন্সিংয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজগুলোতে এসব দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
সিমোর্গ কার্গো বিমানের বাণিজ্যিক অপারেশনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা শোকরি জানান যে, তাদের বর্তমান ব্লুপ্রিন্ট ও কারিগরি পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৪০৬ ইরানি বর্ষেই বিমানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রুটে পূর্ণাঙ্গভাবে তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হবে।
যদিও গত বছর প্রকল্পটির নির্মাণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলাকালীন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি বিঘ্ন ও সাপ্লাই চেইন সংকটের কারণে চূড়ান্ত সনদ অর্জনে সামান্য বিলম্ব হওয়ার কিছুটা শঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা দ্রুততম সময়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্সি দপ্তর মূলত এই বিশাল প্রকল্পে একটি প্রধান সমন্বয়কারী ও পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে এই কার্গো বিমানের সার্টিফিকেশন এবং বাণিজ্যিক পরিচালনার আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ ঘোষণা করার পূর্ণ এখতিয়ার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মূল কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের হাতেই ন্যস্ত রাখা হয়েছে।