মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের জ্বালানি খাতে গ্যাস উৎপাদন কমল ২৩ কোটি ঘনমিটার!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

ইরানের জ্বালানি খাতে গ্যাস উৎপাদন কমল ২৩ কোটি ঘনমিটার!
ছবি : Collected

চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বহুমাত্রিক সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত এক নজিরবিহীন ও গভীর বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে ইরানের জাতীয় গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে তাদের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন অন্তত ২৩ কোটি বা ২৩০ মিলিয়ন ঘনমিটার কমে গেছে।

 

জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি খাতের এই বিশাল ক্ষতি দেশটির অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে এক মারাত্মক সংকট তৈরি করেছে। মঙ্গলবার রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এই উদ্বেগজনক তথ্য গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিদেশি শক্তির সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত এবং ধারাবাহিক হামলার কারণে দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল জ্বালানি অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সার্বিক গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। সরকারের এই শীর্ষ মুখপাত্র আরও জানান, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জ্বালানি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা সরকারের জন্য একটি বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গালফ নিউজের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ইরানের এই বর্তমান অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া তীব্র সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে।

 

ইরানি নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পরিসংখ্যান এবং প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে দেশটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যার আনুমানিক আর্থিক মূল্যমান প্রায় ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 

যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সরাসরি ধ্বংস হওয়া ভৌত অবকাঠামো এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক ক্ষতি-এই দুইয়ে মিলে ইরানের অর্থনীতিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে।

 

সর্বশেষ গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাসের এই নতুন পরিসংখ্যান সেই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসেও তেহরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল।

 

ওই সময় ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছিল যে, বিদেশি আগ্রাসনের ফলে তাদের যেসব জাতীয় সম্পদ এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, তার জন্য আক্রমণকারী দেশগুলোকে অবশ্যই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির প্রতি ইঙ্গিত করে ইরান তাদের এই যৌক্তিক দাবি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামেও উত্থাপন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল। তবে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, ক্ষতিপূরণ আদায় বা কূটনৈতিক সমাধানের পথটি অত্যন্ত জটিল এবং আপাতত দেশের অভ্যন্তরীণ অবশিষ্ট সম্পদ রক্ষার বিষয়টিই সরকারের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস উৎপাদন ২৩ কোটি ঘনমিটার কমে যাওয়ার এই ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পতন নয়, বরং এটি ইরানের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশের বড় বড় শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সাধারণ বাসাবাড়ির গ্যাস সরবরাহে এর ফলে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেবে। এমনিতেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা ইরানের অর্থনীতিতে জ্বালানি রপ্তানি থেকে আসা রাজস্ব একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

 

উৎপাদন কমে যাওয়ার অর্থ হলো রপ্তানির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করবে। ইরানের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

 

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকা সত্ত্বেও, দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কারণে ইরান তার জ্বালানি খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বরাবরই সংগ্রাম করে এসেছে। তার ওপর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উৎপাদন সক্ষমতার এই আকস্মিক ও বিশাল ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা তেহরানের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসক্ষেত্র, পাইপলাইন এবং রিফাইনারিগুলো পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ এবং অত্যাধুনিক বিদেশি প্রযুক্তির প্রয়োজন।

 

কিন্তু বর্তমান যুদ্ধাবস্থা এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘেরাটোপে সেই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা ইরানের জন্য এক প্রকার অসম্ভব একটি কাজ। সার্বিকভাবে, সংঘাতের যে ধ্বংসাত্মক রূপ বর্তমানে দৃশ্যমান হচ্ছে, তা থেকে দ্রুত উত্তরণের কোনো স্পষ্ট পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

 

গালফ নিউজ