শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীন থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০১:১৫ এএম

চীন থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে ইরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইরান।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমাদের প্রবল চাপের মুখেও সামরিক শক্তিমত্তা বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশটি এবার মিত্ররাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করতে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাদের নিজস্ব ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ করেছে।

 

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য উন্নত বিমান বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম বিশাল চালান তেহরানের হাতে পৌঁছাতে যাচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই চালানের আওতায় প্রায় চারশোটি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

ইরানের এই আকস্মিক ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ক্রয়ের নেপথ্যে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও নিজস্ব সুরক্ষার তাগিদ। গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন স্নায়ুযুদ্ধ ও ছায়াযুদ্ধ চলমান রয়েছে।

 

বিভিন্ন সময়ে এই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে, যার ফলে ইরানের অভ্যন্তরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এবং জাতীয় পরিকাঠামোর ওপর সরাসরি সামরিক হামলার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

 

অতীতে বেশ কয়েকবার এ ধরনের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় কিছু কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশ্যে এসেছিল। বিশেষ করে নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা শত্রুপক্ষের ড্রোন, আধুনিক সামরিক হেলিকপ্টার কিংবা অতর্কিত বিমান হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তেহরান নিজেদের আকাশসীমাকে আরও সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছিল।

 

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই নিজেদের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র ও শক্তিশালী করতে তেহরানের এই সমরাস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় এবং কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।

 

এই সামরিক চুক্তির আর্থিক দিক এবং সমরাস্ত্রের কারিগরি দিকগুলো অত্যন্ত চমকপ্রদ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে হওয়া এই অস্ত্র চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ছয় থেকে সাত কোটি মার্কিন ডলার।

 

এই বিশাল বাজেটের আওতায় ইরান মূলত তিনশো থেকে চারশোটি কাঁধে বহনযোগ্য স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করছে। সামরিক পরিভাষায় এগুলো অত্যন্ত কার্যকর ও সহজে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হিসেবে পরিচিত।

 

এই অস্ত্রগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো বহন করার জন্য কোনো ভারী যান বা বিশাল স্থাপনার প্রয়োজন হয় না; বরং একজন সাধারণ সেনাসদস্য খুব সহজেই এটি কাঁধে বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে পারেন এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শত্রুর আকাশযানের ওপর নিখুঁত ও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে পারেন।

 

প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই চুক্তির অধীনে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে চীনের তৈরি ‘কিউডব্লিউ-১২’ এবং ‘এফএন-১৬’ মডেলের অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত রয়েছে।

 

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শত্রুপক্ষের রাডার ফাঁকি দিয়ে এবং আধুনিক জ্যামিং প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম, যা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন ইরানের ওপর নানাবিধ কড়া অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে কীভাবে এত বড় একটি অস্ত্র চুক্তি সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে অনেকের মাঝেই কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।

 

সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, সরাসরি দুই দেশের সরকারের মধ্যে এই লেনদেন সম্পন্ন হয়নি। মূলত পশ্চিমা বিশ্বের নজরদারি এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার জটিলতা এড়াতে একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই সামরিক চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

 

জানা গেছে, হংকংভিত্তিক একটি সুপরিচিত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘ঝংচিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট’-এর মাধ্যমে এই সমরাস্ত্র কেনাবেচার প্রক্রিয়াটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 

তারাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইরানি ঊর্ধ্বতন সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে চীনা সামরিক অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে দিয়েছে, যার ফলস্বরূপ এই সফল অস্ত্র চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, চীন থেকে ইরানের এই বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের বিষয়টি কেবল একটি সাধারণ অস্ত্র কেনাবেচা নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত মিত্রতার অংশ।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং রয়টার্সের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো এই খবরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছে। কারণ, এই অস্ত্রের চালান ইরানের হাতে পৌঁছালে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

 

নিজেদের আকাশসীমাকে বিদেশি আগ্রাসন থেকে সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে যে, যেকোনো ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি প্রস্তুত ও আপসহীন।

 

- আল জাজিরা