শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, রাষ্ট্রদূতের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানাল ভেনেজুয়েলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, রাষ্ট্রদূতের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানাল ভেনেজুয়েলা
ছবি: Collected

দীর্ঘদিনের গভীর মিত্রতা ও কৌশলগত সম্পর্কের মধ্যে হঠাৎ করেই এক অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে ইরান ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচির একটি সাম্প্রতিক ও অনভিপ্রেত মন্তব্যের জেরে কারাকাসে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলয়ের অন্যতম দুই প্রধান মিত্র দেশের মধ্যে এ ধরনের প্রকাশ্য কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। গত মঙ্গলবার ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র দপ্তরে ইরানি রাষ্ট্রদূত আলী চেগেনিকে জরুরি তলব করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বেফাঁস মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

 

ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে ইরানি রাষ্ট্রদূতকে ঠিক কী কারণে তলব করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির এক বিশেষ অনুসন্ধানে এই ঘটনার পেছনের মূল কারণটি উঠে এসেছে।

 

জানা যায়, সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ও সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান ভেনেজুয়েলা নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শর্তে আপস বা সমঝোতা করে চলবে।

 

মূলত মিত্র দেশের একজন শীর্ষ কূটনীতিকের এমন প্রকাশ্য ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যেই চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে কারাকাস। রাষ্ট্রদূত আলী চেগেনিকে তলব করার পর ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে অত্যন্ত অবজ্ঞাপূর্ণ ও অসঙ্গত মন্তব্য করা হয়েছে।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভেনেজুয়েলা অন্য কোনো দেশের এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ মেনে নেবে না। এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে ইরানি রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি বা 'নোট অব প্রটেস্ট' তুলে দেওয়া হয়েছে।

 

এই আকস্মিক কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব এমন দুই দেশের মধ্যে তৈরি হলো, যাদের মধ্যে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে অত্যন্ত নিবিড় ও পরীক্ষিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উভয় দেশই জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কট্টর সমালোচক হিসেবে সমধিক পরিচিত।

 

১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের শাসনকাল থেকে তেহরান ও কারাকাসের মধ্যে এই বিশ্বস্ত মিত্রতা ও মজবুত বাণিজ্য অংশীদারত্বের সূচনা হয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অভিন্ন বিরোধী মনোভাব থেকে এই দুই দেশের মধ্যে নৈকট্য তৈরি হলেও, গত তিরিশ বছরে তা কেবল রাজনৈতিক বলয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

 

বরং জ্বালানি, খনিজ সম্পদ আহরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় খাতগুলোতে তারা বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটে এই দুই দেশ একে অপরের পাশে পরম বিশ্বস্ততার সাথে দাঁড়িয়েছে।

 

উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে ভেনেজুয়েলা যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল, তখন তাদের সাহায্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিল তেহরান। সে সময় নিজেদের অপরিশোধিত তেল শোধন করার মতো ন্যূনতম আর্থিক সংগতিও ভেনেজুয়েলার ছিল না।

 

ঠিক সেই চরম দুঃসময়ে মিত্রতার নিদর্শনস্বরূপ পনেরো লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছিল ইরান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে ভেনেজুয়েলা যখন সাধারণ মানুষের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় টিকা কিনতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ইরান দেশটিতে বিশ লাখেরও বেশি পোলিও এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা পাঠিয়ে স্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অবদান রাখে।

 

বর্তমান এই কূটনৈতিক উত্তেজনার নেপথ্যে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির একটি গভীর প্রভাব রয়েছে। ভেনেজুয়েলার বামপন্থী নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বৈরিতা দীর্ঘদিনের পুরোনো।

 

২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর এই শত্রুতা এক চরম ও নাটকীয় রূপ ধারণ করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি। ওই দিন কারাকাসের সুরক্ষিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এক দুঃসাহসিক ও নজিরবিহীন গোপন অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী ফার্স্টলেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী।

 

ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচার এবং সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে। একসময়ের প্রতাপশালী এই ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি সুরক্ষিত ফেডারেল কারাগারে বন্দিজীবন যাপন করছেন।

 

একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে নিজ বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এমন এক চরম রাজনৈতিক শূন্যতা, জাতীয় শোক ও গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুহূর্তে ইরানের মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতার এমন অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্য ভেনেজুয়েলার সরকার ও জনগণের আত্মসম্মানে তীব্র আঘাত হেনেছে।

 

আর সে কারণেই চরম বন্ধুপ্রতীম দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরানকে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দিতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি কারাকাস। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা দুই দেশের দীর্ঘদিনের অটুট সম্পর্কে ভবিষ্যতে এক নতুন ও জটিল সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।

 

- এএফপি