শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের সর্বোচ্চ গগনচুম্বী ভবন নির্মাণ করছে সৌদি আরব

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম

বিশ্বের সর্বোচ্চ গগনচুম্বী ভবন নির্মাণ করছে সৌদি আরব
ছবি : Collected

বিশ্বের স্থাপত্য ইতিহাসে এক নতুন এবং অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরব। দীর্ঘদিনের জল্পনাকল্পনা এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বাধা অতিক্রম করে দেশটি পুনরায় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গগনচুম্বী ভবন নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যে এই মহাপ্রকল্পের চারশত ত্রিশ মিটার পর্যন্ত নির্মাণকাজ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকদের তথ্যমতে, সম্পূর্ণ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটি দুবাইয়ের বিশ্বখ্যাত বুর্জ খলিফাকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের নতুন এবং অনন্য রেকর্ড গড়বে।

 

এটি কেবল একটি সাধারণ ভবন নয়, বরং এটি আধুনিক প্রকৌশল ও মানুষের অসীম সক্ষমতার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজে প্রকাশিত একটি বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই মেগা প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

এই বহুল আলোচিত প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী এবং সৌদি আরবের বিশিষ্ট ধনকুবের যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন তালাল আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, নির্মাণাধীন এই সুউচ্চ ভবনটির চূড়ান্ত উচ্চতা এক হাজার মিটারেরও বেশি অর্থাৎ এক কিলোমিটারের অধিক করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

 

তিনি আরও জানিয়েছেন যে, ইতিমধ্যে মূল প্রকল্পের চল্লিশ শতাংশেরও বেশি নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং বাকি কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও নিখুঁতভাবে এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি যুবরাজ আল-ওয়ালিদ সরাসরি নির্মাণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে সেখানে কর্মরত প্রকৌশলী, স্থপতি ও শ্রমিকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষাৎ করেছেন এবং কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

 

তার এই আকস্মিক ও সরাসরি পরিদর্শন দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আংশিক স্থগিত থাকা এই মেগা প্রকল্পটি যে পুনরায় পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয়েছে, তারই এক সুস্পষ্ট ও জোরালো ইঙ্গিত বহন করে।

 

এ বিষয়ে যুবরাজ আল-ওয়ালিদ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় ভবনের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে এবং তারা অত্যন্ত সফলভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণের এই ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করতে সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।

 

এই স্থাপত্য বিস্ময়ের পেছনের ইতিহাস বেশ ঘটনাবহুল এবং চড়াই-উতরাইয়ে পরিপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিকভাবে জেদ্দার এই সুবিশাল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৩ সালে।

 

কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী নানামুখী আর্থিক সংকট এবং মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশ কিছু কাঠামোগত ও চুক্তিভিত্তিক জটিলতার কারণে ২০১৮ সালে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ হঠাৎ করেই স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘ সাত বছরের চরম অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে ২০২৫ সালে নতুন উদ্যমে এবং পরিবর্তিত ও আরও যুগোপযোগী পরিকল্পনায় এর নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়।

 

আন্তর্জাতিক স্থাপত্য বিশারদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই ভবনের উচ্চতা যখন এক কিলোমিটার বা এক হাজার মিটার ছাড়িয়ে যাবে, তখন এটি কেবল বর্তমান রেকর্ডধারী দুবাইয়ের আটশত আঠাশ মিটার উচ্চতার বুর্জ খলিফাকেই অতিক্রম করবে না, বরং এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম এক কিলোমিটার উচ্চতার ভবন হিসেবে এক অভাবনীয় ও চিরস্থায়ী রেকর্ড স্থাপন করবে।

 

বিশাল এই ভবনের অভ্যন্তরে ঠিক কী কী বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা থাকছে, তা নিয়ে বিশ্ববাসীর কৌতূহলের কোনো অন্ত নেই। গালফ নিউজের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সুবিশাল কাঠামোর ভেতরে সর্বাধুনিক সুবিধাসংবলিত বিলাসবহুল আবাসিক প্রকোষ্ঠ, আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারা অতিথিশালা, বৃহৎ পরিসরের আধুনিক দাপ্তরিক স্থান এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক অভাবনীয় উচ্চতায় একটি বিশাল ও অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা মানমন্দির তৈরি করা হবে।

 

মূলত জেদ্দা ইকোনমিক সিটি নামক একটি বিশাল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক নগরের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে এই আকাশচুম্বী কাঠামোটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্মাণ করা হচ্ছে। সৌদি আরবের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিলাসবহুল পর্যটন খাতকে আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দেশটির সরকারের যে পাঁচ কোটি সত্তর লাখ বর্গফুট আয়তনের একটি অতি বৃহৎ নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে, এই সুউচ্চ গগনচুম্বী ভবনটি মূলত তারই একটি অবিচ্ছেদ্য, দৃশ্যমান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এই বিশাল, ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত জটিল কাঠামোগত প্রকল্পের নির্মাণকাজের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে জেদ্দা ইকোনমিক কোম্পানি। আর তাদের এই ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক উদ্যোগে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সার্বিক আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করছে যুবরাজ আল-ওয়ালিদের নিজস্ব সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান কিংডম হোল্ডিং কোম্পানি।

 

এত বড় মাপের একটি আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্য নির্মাণে জেদ্দা ইকোনমিক কোম্পানি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য বেশ কয়েকটি নির্মাণ, নকশা ও স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছে।

 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অ্যাড্রিয়ান স্মিথ অ্যান্ড গর্ডন গিল আর্কিটেকচার, থর্নটন টোমাসেটি, ল্যাঙ্গান ইন্টারন্যাশনাল এবং সৌদি আরবের নিজস্ব বৃহৎ নির্মাণ সংস্থা সৌদি বিনলাদিন গ্রুপ।

 

আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী স্থাপত্যশৈলীর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যেই এই গগনচুম্বী ভবনের সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ সফলভাবে শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সফলভাবে নির্মিত হলে তা শুধু সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সক্ষমতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে।

 

- গালফ নিউজ