শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা

সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াতে বাহরাইনে ছয় দেশের যৌথ মহড়া শুরু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াতে বাহরাইনে ছয় দেশের যৌথ মহড়া শুরু
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক সক্ষমতা ও পারস্পরিক যুদ্ধ প্রস্তুতি আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে বাহরাইনে শুরু হয়েছে এক বৃহৎ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যৌথ সামরিক মহড়া।

 

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী ছয়টি আরব দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণে এই বিশেষ মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে। আগামী তিন দিন ধরে উপসাগরীয় এই দেশটিতে এই নিবিড় সামরিক অনুশীলন ও কৌশলগত মহড়া চলবে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে নানামুখী সংঘাত ও নিরাপত্তার চরম অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, মূলত সেই সম্ভাব্য যেকোনো বাহ্যিক আক্রমণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলার জন্য নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতেই আরব দেশগুলোর এই সমন্বিত উদ্যোগ।

 

বুধবার, ঊনত্রিশে জুলাই, কাতারভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামরিক পদক্ষেপের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানো হয়েছে।

 

বাহরাইনের জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি-ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস সদস্যরা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন।

 

ইতিমধ্যে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এই বিশাল সামরিক কর্মযজ্ঞ পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয়ে গেছে। এই সামরিক জোটের সদস্য দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার এবং স্বাগতিক দেশ বাহরাইন।

 

এই রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ছয়টি দেশের এই যৌথ উপস্থিতি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ও স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।

 

এই মহড়ার সার্বিক দিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেছেন স্বাগতিক দেশ বাহরাইন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ধিয়াব বিন সাকর আল-নুয়াইমি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, আটাশ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ত্রিশ জুলাই পর্যন্ত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিচালিত হতে যাওয়া ‘বাহরাইন শিল্ড’ নামক এই বিশেষ মহড়ার প্রধান ও অন্যতম লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি বহুগুণে বৃদ্ধি করা।

 

পাশাপাশি আধুনিক ও উন্নত সামরিক অভিযানের জটিল কৌশলগুলো আয়ত্ত করা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমন্বয় আরও অনেক বেশি জোরদার করা।

 

জেনারেল আল-নুয়াইমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনীর এই সম্মিলিত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ মূলত এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নানাবিধ নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ শক্ত হাতে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর যৌথ উপসাগরীয় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করছে।

 

উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বাহরাইনের এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা আরও জানান যে, এই যৌথ মহড়া সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সংহতি ও ঐক্যের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।

 

শুধু তাই নয়, বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ কিংবা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ও ঐক্যবদ্ধভাবে জবাব দেওয়ার যে সম্মিলিত সক্ষমতা, তা এই মহড়ার মাধ্যমে আরও সুসংহত ও শাণিত হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন সংঘাত, সহিংসতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল-নুয়াইমি বলেন, এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক অস্থির পরিস্থিতি একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো করে তুলেছে।

 

বিশেষ করে অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হামলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই দেশগুলোর মধ্যে যৌথ সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও নিবিড় ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

এই আনুষ্ঠানিক মহড়া শুরুর আগেই বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা জানানো হয়েছিল। সেই বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, এই মহড়ার মূল লক্ষ্য কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী যৌথ সামরিক সহযোগিতা জোরদার করা।

 

এছাড়া প্রতিটি দেশের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব উন্নত ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সামরিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও রণকৌশল একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করা এবং বর্তমান যৌথ সামরিক ব্যবস্থাগুলো বাস্তবক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ও ফলপ্রসূ, তার একটি নিখুঁত ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করাও এই মহড়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

 

বিশ্ব রাজনীতির এই চরম উত্তেজনাকর সময়ে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের এই ছয়টি সদস্য দেশের এমন সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ সামরিক প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমীকরণে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

- আল জাজিরা