আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী রাত আটটায় এবং বাংলাদেশ সময় ঠিক ভোর ছয়টার দিকে এই নতুন সামরিক অভিযানের সূচনা হয়। বিগত কিছুদিন ধরে চলা অস্থিরতা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর এই আকস্মিক হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এই নতুন করে শুরু হওয়া হামলার পরপরই মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ও জরুরি বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। সেন্টকম তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, গত বুধবার মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্বার্থকে লক্ষ্য করে ইরান যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল, তার একটি যুতসই, উপযুক্ত ও কঠোর জবাব দিতেই আজকের এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
মূলত নিজেদের সামরিক বাহিনীর নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই এই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন। এই চলমান সংঘাতের গভীর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বিষয়ক ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন।
তাদের দেওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরের দিকে মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বন্দর দামিয়েত্তায় একটি অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সেখানে নোঙর করে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার জাহাজের ওপর একটি ইরানি ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে।
এই ভয়াবহ ড্রোন হামলার পরপরই ওই বন্দরটিতে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঠিক সেই সময়টিতেই মার্কিন এবং সৌদি আরবের সেনাবাহিনী যৌথ উদ্যোগে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে অবস্থানরত ইরানপন্থি বিভিন্ন সামরিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বিমান অভিযান পরিচালনা করছিল।
মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ট্যাংকার জাহাজে যখন এই ভয়াবহ ড্রোন হামলা সংঘটিত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে রূপ নেয়। তবে মিসরের সরকারি পর্যায় থেকে এই ঘটনার আংশিক সত্যতা স্বীকার করা হলেও পুরোপুরি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
গতকাল মিসরের পেট্রোলিয়াম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দামিয়েত্তা বন্দরে আগুন লাগার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো ড্রোন হামলা বা সামরিক আঘাতের কোনো বিষয়ের উল্লেখ মন্ত্রণালয়ের ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে একেবারেই ছিল না।
মিসরের ওই বন্দরে হামলার ঠিক কাছাকাছি সময়ে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ও অভিজাত শাখা হিসেবে পরিচিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি বিধ্বংসী ড্রোন এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এই বহুমুখী হামলার ঘটনা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ওই অঞ্চলে উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারে বদ্ধপরিকর এবং কেউই বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন বাহিনীর এই পাল্টা আঘাত হানার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সেখানে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও কঠোর ভাষায় এই উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জর্ডানে অবস্থিত আমাদের সামরিক ঘাঁটির ওপর ইরান যে অন্যায় হামলা চালিয়েছে, এখন সময় এসেছে তার জবাব দেওয়ার।
এখন আমাদের পালা এবং আমাদের পক্ষ থেকে এর জবাব হবে অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর। তবে এই কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারির পাশাপাশি তিনি একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছেন যে, সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তেহরানের সঙ্গে একটি টেকসই শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ওয়াশিংটনের যে নিরলস প্রচেষ্টা, তা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
সাম্প্রতিক এই সংঘাতের মূল শিকড় খুঁজতে গেলে বেশ কিছুটা পেছনের দিকে তাকাতে হবে। গত ১৭ জুন ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সাময়িকভাবে এক ধরনের যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
কিন্তু জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ট্যাংকার জাহাজের ওপর ইরান আচমকা ড্রোন হামলা চালালে সেই শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ফাটল ধরে।
আমিরাতের জাহাজে সেই হামলার কড়া জবাব দিতে মার্কিন সেন্টকমও কালক্ষেপণ না করে পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর টানা ১৩ দিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে এক শ্বাসরুদ্ধকর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।
অবশেষে গত ২৫ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই অঘোষিতভাবে এক ধরনের ‘বিরতি’ পালন করে আসছিল, যা আজকের এই মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে আবারও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেল।
এদিকে গতকাল বুধবার গভীর রাতে ইরানের প্রতিরক্ষাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। ওই দীর্ঘ বিবৃতিতে তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর তাদের সুপরিকল্পিত হামলার কথা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ও দম্ভের সঙ্গে স্বীকার করে নিয়েছে।
একই বিবৃতিতে তারা আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছে। সম্প্রতি কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যৌথভাবে পরিচালনা করার জন্য তেহরানকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ওমান। কিন্তু ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার ওমানের সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে আইআরজিসি তাদের বুধবারের বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে।