একই সঙ্গে কৌশলগত দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে তেহরান।
এই ঘোষণার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সামরিক অস্থিরতা দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে জানা যায়, বৃহস্পতিবার আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই কড়া বার্তা প্রদান করে।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো বিদেশি আক্রমণকারী শক্তিকে আঞ্চলিকভাবে সাহায্য বা সামরিক রসদ প্রদানের যেকোনো অপচেষ্টা অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং এর ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আঞ্চলিক রাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিবৃতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জন্য একটি প্রত্যক্ষ সতর্কবার্তা।
এর মাধ্যমে তেহরান মূলত এটাই বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশপথ ব্যবহার করতে দিলে সেই দেশগুলোকেও সরাসরি সংঘাতের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। বিগত কয়েক মাস ধরে এই অঞ্চলে যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, আইআরজিসির এই বিবৃতি তাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল।
বিবৃতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গটি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে আইআরজিসি।
বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ড এবং আইআরজিসি নৌবাহিনীর অকুতোভয় নাবিকদের এই জলপথের ওপর পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা কোনো বহিরাগত শক্তিকে এই অঞ্চলে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ চলাচলের যুক্তিতে ওই অঞ্চলে টহল দিয়ে আসছে। ইরানের এই স্পষ্ট অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা নিজেদের জলসীমার নিরাপত্তা রক্ষায় যেকোনো ধরনের চরম পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তারা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আঞ্চলিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে মার্কিন কর্তৃপক্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, অতিরঞ্জিত সামরিক তৎপরতা এবং অনবরত হুমকি প্রদর্শন যতদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ততদিন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথটি উন্মুক্ত করা হবে না।
অর্থাৎ, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই জলপথের স্বাভাবিক কার্যক্রম এখন সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর নির্ভরশীল বলে দাবি করছে তেহরান। তাদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব একান্তভাবেই এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব বিষয়, এখানে কোনো বিদেশি শক্তির খবরদারি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই কঠোর অবস্থান মার্কিনিদের নৌ-নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে এই জলপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়।
ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরনের সামরিক অচলাবস্থা বা সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই ধারাবাহিক বাগ্যুদ্ধ এবং সামরিক পেশিশক্তি প্রদর্শনের মহড়া পুরো অঞ্চলকেই একটি বড় ধরনের সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এবং ওয়াশিংটন প্রশাসন তেহরানের এই চরম বার্তার পর নিজেদের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনে কি না। তবে এটি দৃশ্যমান যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৃষ্ট এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব খুব সহসাই প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।