তবে তিন দিক থেকে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হয়ে অবশেষে নিজেদের দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হয়েছে দেশটি। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সর্বোচ্চ স্বার্থে এখন তাদের নতুন করে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন এবং জটিল মাত্রা যোগ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত আধা-সামরিক বাহিনীর ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।
রিয়াদের প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট দাবি, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিই সম্প্রতি সৌদি রাজতন্ত্রের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরও রিয়াদের সামনে এখন এক কঠিন সমীকরণ ও চরম সিদ্ধান্তহীনতা এসে দাঁড়িয়েছে।
তারা কি নিজেদের ভূখণ্ড ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিপক্ষকে দমাতে এই পালটা আক্রমণের ধারা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত রাখবে, নাকি অপ্রকাশ্য কূটনৈতিক আলোচনা ও অর্থ লেনদেনের পুরোনো কৌশলে ফিরে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবে, তা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় ও বিতর্ক রয়েছে।
বর্তমানে এই উত্তেজনার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক বলয়। একদিকে অবস্থান করছে ইরান, তাদের প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী এবং ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের মতো আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
অন্যদিকে শক্ত অবস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এবং তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও জর্ডান। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল এই মুহূর্তে দৃশ্যত নিষ্ক্রিয় থাকলেও আঞ্চলিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অতি সম্প্রতি ইরান জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত পানিপথ ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপরও তারা নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জোরদার করেছে।
ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের নতুন করে এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হওয়া পুরো অঞ্চলটিকে ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সৌদি আরবের জন্য এই জাতীয় নিরাপত্তার সংকট একেবারেই নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়।
এর আগে ২০১৯ সালে তাদের অন্যতম প্রধান দুটি তেল শোধনাগার আবকাইক ও খুরাইসে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় রিয়াদ অভাবনীয় অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছিল। ওই হামলার ফলে তাদের দৈনন্দিন তেল রপ্তানি রাতারাতি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে, যা বিশ্ববাজারের সামনে তাদের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, অতি সম্প্রতি সেই একই আবকাইক তেল কেন্দ্রে ইরাকভিত্তিক আধা-সামরিক গোষ্ঠীগুলো আবারও নতুন করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু টার্মিনালে তেল পাঠানোর মাধ্যমে রপ্তানি সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
কিন্তু গত জুলাই মাসে ইয়েমেনি সরকারের সমর্থনে সৌদি আরব সানা বিমানবন্দরে বিমান থেকে বোমা হামলা চালানোর পর, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এর ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'বাব আল-মান্দেব' প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহণ আবারও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে ইয়েমেনে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেও রিয়াদ হুথিদের পুরোপুরি দমন করতে সক্ষম হয়নি।
বরং আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপ বিবেচনায় ২০২২ সালে এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাদের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপনীত হতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে উত্তর দিক থেকে ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর চোরাগোপ্তা আক্রমণ এবং দক্ষিণ দিক থেকে হুথিদের সক্রিয় ও আগ্রাসী প্রতিরোধী অবস্থান সৌদি আরবকে এক চরম রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের একটি নতুন, আধুনিক ও শক্তিশালী পরিচয় গড়ে তোলার যে দূরদর্শী অর্থনৈতিক রূপকল্প সৌদি আরব গ্রহণ করেছে, বর্তমানের এই বহুমুখী সংঘাত সেই স্বপ্নকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
তাই রিয়াদ এখন এক গভীর সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে-তারা কি মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সক্রিয় অংশ হয়ে ইরান বলয়ের সঙ্গে সরাসরি শক্তিক্ষয়ে নামবে, নাকি নিজেদের বিশাল অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বাঁচাতে নতুন কোনো আপস বা কূটনৈতিক কৌশলের পথ বেছে নেবে।