তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই সংঘাতে ওয়াশিংটনের সার্বিক সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকাকে একটি ভয়াবহ এবং ঐতিহাসিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর সুচিন্তিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তার পূর্বনির্ধারিত কোনো কৌশলগত লক্ষ্যই অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।
বরং এর প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক ফলাফল হিসেবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুদৃঢ় সামরিক অবস্থান, দীর্ঘদিনের আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক জোটকাঠামো এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বিষয়টিকে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ‘আনসেন্সরড’ নামক একটি জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত যুদ্ধ ও সার্বিক সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা, নিরপেক্ষ ও বিস্তৃত পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন।
ওই অনুষ্ঠানে তিনি জোরালো যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দাবি করেন যে, এই অসম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এক বিধ্বংসী ও অভাবনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সামরিক অভিযান ও সংঘাতের একেবারে শুরুর দিকে পেন্টাগন এবং মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা যেসব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে অগ্রসর হয়েছিলেন, তার একটিও তারা বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি।
তাঁর এই বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং পেন্টাগনের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক মিয়ারশাইমার তাঁর আলোচনায় অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই সংঘাতের সূচনায় ওয়াশিংটন মূলত চারটি প্রধান ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখে তাদের ঘুঁটি সাজিয়েছিল।
প্রথমত, তাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরানে একটি সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের সম্পূর্ণ অনুকূল একটি আজ্ঞাবহ রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত আলোচিত ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ও পারমাণবিক অবকাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া।
তৃতীয়ত, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ, লেবাননের শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি তেহরানের যে অব্যাহত আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন রয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে বাধ্য করা।
এবং সর্বশেষ, ইরানের ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত শক্তিশালী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত রূঢ়। মিয়ারশাইমারের মতে, বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যের একটিও অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, যা তাদের কৌশলগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই প্রবীণ ও বিদগ্ধ অধ্যাপক তাঁর বিশ্লেষণে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয়গুলো অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই অপরিণামদর্শী ও একগুঁয়ে যুদ্ধের ফলে গোটা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ও মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো এবং সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় ওয়াশিংটন গত কয়েক দশক ধরে যে শক্তিশালী জোটব্যবস্থা ও অটুট প্রভাব বলয় তৈরি করেছিল, তা আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই সংঘাতের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব কেবল সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা এবং সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এরই পাশাপাশি এই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের বিস্তৃতির কারণে সামরিক পদক্ষেপের বলি হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টিও তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংঘাতের জেরে সম্প্রতি ইরাকের ভূখণ্ডে চালানো সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি অত্যন্ত কড়া ও গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ওই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের একতরফা হামলা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইনের পরিপন্থী এবং এটি ইরাকের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর এহেন নগ্ন হামলাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করে তুলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূল্যায়নের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার অত্যন্ত হতাশার সাথে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান এই চরম বিপর্যয়কর ও জটিল পরিস্থিতি থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিকল্প কৌশল বা বাস্তবসম্মত রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি।
তাঁর মতে, পেশিশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সব কিছু সমাধানের যে আগ্রাসী নীতি ওয়াশিংটন গ্রহণ করেছিল, তা আধুনিক বিশ্বে সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তাই তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, চলমান এই গভীর ও বহুমুখী সংকটের কোনো সামরিক সমাধান একেবারেই সম্ভব নয়; সংঘাত এড়াতে এখন কেবল কূটনৈতিক পথই একমাত্র খোলা রয়েছে।