মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে এই সংকট নিরসন এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশ ওমানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তেহরানে নিয়মিত ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিশ্ব রাজনীতির অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মূহুর্তে জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলমান সামরিক উত্তেজনার পারদ হ্রাস করতে ওমানের সমন্বিত মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ইসমাঈল বাকায়ি রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলার উপায় অনুসন্ধানে ওমানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা নিরবচ্ছিন্নভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন, গত সপ্তাহে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে যে বৈঠক শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবারও তেহরানে ওমানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে।
ওমান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো জটিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও সংঘাত নিরসনে একটি সুসংহত, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বৈশ্বিক নৌ-সংকট কাটাতে তেহরান ও মাসকাট অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করছে বলে মুখপাত্রের বক্তব্যে পরিষ্কার ফুটে ওঠে।
ইরানি বার্তা সংস্থা আইএলএনএ-কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুখপাত্র ইসমাঈল বাকায়ি বর্তমান আন্তর্জাতিক জলপথের নাজুক পরিস্থিতির আদ্যোপান্ত ব্যাখ্যা করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান এই অচলাবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং ওয়াশিংটনের গৃহীত আগ্রাসী নীতি এবং বেপরোয়া সামরিক তৎপরতারই প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া।
বাকায়ি বলেন, এই পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একদম সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে গৃহীত একতরফা পদক্ষেপ এবং এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে যে কৃত্রিম অনিরাপত্তা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার কারণেই মূলত বর্তমানে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
মূলত আমেরিকার অবিবেচকমূলক কর্মকাণ্ড এবং উসকানিমূলক সামরিক অবস্থানের কারণেই বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও সাধারণ জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিপর্যস্ত হচ্ছে।
বর্তমান সংকটের পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইরানি মুখপাত্র উল্লেখ করেন যে, গত ২৮ মার্চ থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন এবং একের পর এক বৈরী পদক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যাতায়াতকারী সাধারণ ও বাণিজ্যিক ইরানি জাহাজের ওপর বারবার প্রত্যক্ষ হামলা চালিয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী।
এর পাশাপাশি ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটগুলোতে অবৈধ ও বেআইনিভাবে অবরোধ আরোপের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, ইরানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে এবং সামরিক ও নাগরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত বিমান হামলা এই পুরো পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলকে এক বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমরবিদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি অংশ কেবল হরমুজ প্রণালীর এই সরু সামুদ্রিক রুট দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের কারণে এই প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতিমধ্যেই চরম অস্থিতিশীলতা ও ভীতির সঞ্চার হয়েছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে ওমানের মতো অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি পুনরুদ্ধারে কিছুটা আশা জাগালেও, ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে সংঘাত বন্ধের মূল চাবিকাঠি রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হাতে।
তেহরানের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার; আন্তর্জাতিক নৌপথের স্থায়ী নিরাপত্তা ও মুক্ত জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সকল প্রকার আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপ, বেআইনি অবরোধ এবং বিমান হামলা চিরতরে বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় এ ধরণের কোনো মধ্যস্থতাই কার্যকর ফল বয়ে আনতে সক্ষম হবে না।