আঞ্চলিক বাণিজ্য, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও সুদৃঢ়, নিরবচ্ছিন্ন ও গতিশীল করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে উভয় দেশের সরকার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই বহুল প্রতীক্ষিত ট্রানজিট রুটটি কার্যকরভাবে চালু হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কেবল পণ্য চলাচলের পরিমাণ ও বিনিয়োগই বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে না, বরং এটি সমগ্র ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি ইতিবাচক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
বিশ্বায়নের এই যুগে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই, আর সেই লক্ষ্য পূরণে এই করিডোরটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই প্রকাশিত ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-এর একটি বিশদ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক পরিবহন কূটনীতি জোরদার করার অংশ হিসেবে সম্প্রতি উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও নিবিড় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ইরানের পক্ষে অত্যন্ত জোরালোভাবে নেতৃত্ব দেন দেশটির সড়ক ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপমন্ত্রী এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহন সংস্থার প্রধান রেজা আকবারি। অন্যদিকে, আর্মেনিয়ার সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির আঞ্চলিক প্রশাসন ও অবকাঠামো মন্ত্রণালয়ের সুযোগ্য উপমন্ত্রী ক্রিস্টিনে গালেচিয়ান।
এছাড়াও, এই উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। তারা মূলত সড়কপথে পরিবহন সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বিদ্যমান ট্রানজিট অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিরাজমান নানাবিধ আইনি ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে অত্যন্ত বিশদ, গঠনমূলক ও কার্যকর আলোচনা সম্পন্ন করেন।
নীতিনির্ধারণী ওই বৈঠকের বিস্তারিত আলোচনা ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইরানের উপমন্ত্রী রেজা আকবারি সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন। তিনি জানান যে, দুই দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পর্যায়ের পূর্ববর্তী ধারাবাহিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করে ইতোমধ্যে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই প্রস্তাবিত চুক্তিতে মূলত দ্বিপাক্ষিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সীমান্তে পণ্য ও যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, পরিবহন টোল যৌক্তিকীকরণ বা ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ বাতিল এবং ইরান ও আর্মেনিয়ার ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক ট্রানজিট বহরগুলোর সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বাণিজ্য-বান্ধব বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রেজা আকবারি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, পার্শ্ববর্তী ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বর্তমানে ইরানের সামনে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ইরান-আর্মেনিয়া-জর্জিয়া করিডোরটি পুরোদমে চালু করা সম্ভব হলে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুদৃঢ় হবে এবং এটি এশিয়ার সাথে ইউরোপের স্থল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও টেকসই বিকল্প ট্রানজিট রুট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
অন্যদিকে, এই পরিবহন ও ট্রানজিট চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে আর্মেনিয়ার উপমন্ত্রী ক্রিস্টিনে গালেচিয়ান অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বমঞ্চে ইরানের সাথে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং পরিবহন সহযোগিতা সম্প্রসারণের এই যৌথ উদ্যোগকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, আর্মেনিয়ার নিজ ভূখণ্ডেও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মানোন্নয়নে সরকারের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
তাঁর মতে, ট্রানজিট অবকাঠামোর এই পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মানের উন্নয়ন এবং এর সাথে আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দীর্ঘ যাত্রাপথে পণ্যবাহী পরিবহন চালকদের সীমাহীন ভোগান্তি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
একই সাথে, উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি আন্তঃসীমান্ত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ, কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং সময়োপযোগী করে তুলবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই করিডোরটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কেবল ইরান ও আর্মেনিয়ার দ্বিপাক্ষিক অর্থনীতির জন্যই লাভজনক হবে না, বরং এর অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করবে জর্জিয়াসহ পুরো ককেশাস অঞ্চলের আপামর জনগণ।
পরিশেষে উপমন্ত্রী গালেচিয়ান গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আয়োজিত বিশেষায়িত বৈঠকগুলোতে এই সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাবিত প্রতিটি ধারা ও উপধারা আরও নিখুঁতভাবে এবং বিস্তারিত পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হবে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই চুক্তিগুলোর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইরান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা অচিরেই এক নতুন এবং অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে দুই দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।