শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রটোকল ভেঙে হুডি ও হাফপ্যান্টে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন সিনেটর ফেটারম্যানের বৈঠক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

প্রটোকল ভেঙে হুডি ও হাফপ্যান্টে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন সিনেটর ফেটারম্যানের বৈঠক
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক ব্লেয়ার হাউজে বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন প্রখ্যাত মার্কিন সিনেটর জন ফেটারম্যান।

 

তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অত্যন্ত পরিচিত ও প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে এই বৈঠকটি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে মূলত সিনেটরের ব্যতিক্রমী পোশাক নির্বাচনের কারণে।

 

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ভূ-রাজনৈতিক আলোচনা চলাকালীন সিনেটর ফেটারম্যানের পরনে ছিল একটি সাধারণ কালো রঙের হুডি এবং হালকা ধূসর রঙের হাফপ্যান্ট। প্রথাগত আনুষ্ঠানিক স্যুট ও টাইয়ের বদলে এমন একান্তই আটপৌরে ও অনানুষ্ঠানিক পোশাকে, পায়ের ওপর পা তুলে বসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এই আলাপের দৃশ্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

তবে পোশাকের এই সরলতা তাঁর রাজনৈতিক বার্তার তীব্রতাকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি; বরং এই নিবিড় বৈঠকের মধ্য দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে নিজের অত্যন্ত কঠোর অবস্থান এবং ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন ও অটল সমর্থনের কথা বিশ্ববাসীর সামনে আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।

 

বৈঠকের একেবারে প্রারম্ভিক পর্যায়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন এই সিনেটরকে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন ও অবিচল সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও অবিচ্ছেদ্য মিত্রতা রক্ষায় জন ফেটারম্যান সর্বদাই এক অনন্য রাজনৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন।

 

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যখন নানামুখী চাপের সম্মুখীন, ঠিক সেই মুহূর্তে ফেটারম্যানের মতো একজন প্রভাবশালী মার্কিন রাজনীতিবিদের এমন অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলের জনগণের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

 

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েলের সমগ্র সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকেও তিনি সিনেটরকে তাঁর এই অটল ও সাহসী ভূমিকার জন্য বিশেষ সাধুবাদ জানান। কূটনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার এক পর্যায়ে সিনেটর জন ফেটারম্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষত নিজের রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বর্তমান নীতি ও ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও প্রকাশ্য সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি।

 

তিনি অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের জটিল ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর নিজ দলের একাংশের কাজকর্ম ও নীতিগত অবস্থান তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

 

এই প্রসঙ্গে মার্কিন রাজনীতিক ও নিউইয়র্কের প্রভাবশালী নেতা জোহরান মামদানির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে ফেটারম্যান জোরালোভাবে দাবি করেন যে, বর্তমানে দলের অভ্যন্তরে ইসরায়েলবিরোধী নেতিবাচক স্রোতের বিরুদ্ধে একমাত্র তিনিই সবচেয়ে সোচ্চার ও একক কণ্ঠস্বর হিসেবে নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

মার্কিন কংগ্রেসে নিজেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘বিবেকের প্রতীক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করার জন্য তাঁর মনে বিন্দুমাত্র কোনো অনুশোচনা বা দ্বিধা নেই এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো চরম বৈরী পরিস্থিতিতে তিনি ইসরায়েলের পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

গাজা উপত্যকা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বর্তমানে যে ব্যাপক মাত্রার সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, তাকে শুরু থেকেই একটি অত্যন্ত যৌক্তিক, অপরিহার্য এবং ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ বলে প্রকাশ্যে আখ্যা দিয়ে এসেছেন সিনেটর ফেটারম্যান।

 

নেতানিয়াহুর সাথে এই ঐতিহাসিক বৈঠকেও তাঁর এই সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো নড়চড় হয়নি। বরং তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে যুক্তি তুলে ধরেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস এবং লেবাননভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস বা নির্মূল করা অত্যন্ত জরুরি।

 

একই সঙ্গে, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকারী অন্যতম প্রধান শক্তি ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে দুর্বল করে দেওয়াটাও সমান্তরালভাবে অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।

 

সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সমালোচকদের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে ফেটারম্যান গভীর আক্ষেপের সুরে মন্তব্য করেন যে, বর্তমান বিশ্ববাসী দুর্ভাগ্যজনকভাবে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে বসেছে ঠিক কী কারণ ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে এই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।

 

তাঁর মতে, সংঘাতের মূল কারণকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ইসরায়েলের বর্তমান আত্মরক্ষামূলক সামরিক পদক্ষেপের একতরফা সমালোচনা করাটা একেবারেই অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সূক্ষ্ম মূল্যায়নে, ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক ব্লেয়ার হাউজে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কেবল একটি প্রথাগত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা সৌজন্য সাক্ষাৎই ছিল না, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং চলমান বৈশ্বিক কূটনীতির একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

একদিকে সিনেটর জন ফেটারম্যানের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও প্রথাভাঙা পোশাক আন্তর্জাতিক কূটনীতির চিরাচরিত, অলিখিত ও অত্যন্ত সংরক্ষিত প্রটোকলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়েছে।

 

অন্যদিকে, তাঁর ইসরায়েলপন্থী কট্টর ও আপসহীন অবস্থান তাঁর নিজ দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে বিরাজমান অত্যন্ত গভীর ও প্রকট মতাদর্শগত বিভাজনকে আরও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে।

 

বর্তমান সময়ে যখন গাজা ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং খোদ জাতিসংঘের মতো বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল ব্যাপক সমালোচনা ও প্রবল কূটনৈতিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে মার্কিন কংগ্রেসের এমন একজন প্রবীণ ও প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকের নিঃশর্ত, প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থন নির্দ্বিধায় প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত, সামরিক ও রাজনৈতিক জোট এখনো কতটা অটুট ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

 

বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত সাধারণ ও আনুষ্ঠানিকতা বিবর্জিত পোশাকে মোড়ানো থাকলেও এই বৈঠকে প্রদান করা ফেটারম্যানের রাজনৈতিক বার্তাটি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, সুনির্দিষ্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ, যা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির নীতিনির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

- পিএমও ইসরায়েল