শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মিশরকে সতর্ক করল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

ইসরায়েলের ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মিশরকে সতর্ক করল ইরান
ছবি: Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় মিশরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ছদ্মবেশী ধ্বংসাত্মক অভিযানের বিষয়ে কায়রোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।

 

সম্প্রতি মিশরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে সংঘটিত ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা গণমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের কড়া জবাব দিতে গিয়ে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিবৃতির মাধ্যমে ইরান মূলত মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টাকে নস্যাৎ করার একটি জোরালো কূটনৈতিক বার্তা প্রদান করেছে।

 

গত বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি এই বিষয়ে তার দেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি মিশরকে সমগ্র অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বন্ধু ও অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কায়রোর জাতীয় নিরাপত্তা তেহরানের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করার সুদূরপ্রসারী অসৎ উদ্দেশ্যে ইসরায়েল যে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ছদ্মবেশী হামলার ষড়যন্ত্র করছে, সে বিষয়ে প্রতিটি দেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

 

মূলত নিজেদের পরিচয় গোপন করে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর এই কূটকৌশলটি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। আরাকচি তার বিবৃতিতে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন।

 

তিনি মনে করেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা ইসরায়েলের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে আসা এই সুস্পষ্ট ও যৌথ হুমকিটি মূলত মুসলিম বিশ্বের সম্ভাব্য ঐক্যের ভয় থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

 

তাই এই মুহূর্তে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই ধরনের সুগভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার আর কোনো বিকল্প পথ নেই বলে তিনি তার বার্তায় পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছেন।

 

এদিকে, সম্প্রতি মিশরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দামিয়াত বন্দরে অবস্থানরত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে রহস্যজনক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরপরই বেশ কয়েকটি পশ্চিমা প্রভাবশালী গণমাধ্যম কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই এই হামলার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জল্পনাকল্পনা ছড়াতে শুরু করে।

 

তবে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি। তিনি পশ্চিমা গণমাধ্যমের এই তৎপরতাকে অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সম্পর্ককে বিনষ্ট করার জন্যই এই ধরনের বানোয়াট খবর প্রচার করা হচ্ছে।

 

ইসমাইল বাকায়ি তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মিশরের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ইরানের যে অবিচল ও নীতিগত শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, তা আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, মিশরের দামিয়াত বন্দরে ঘটা ওই ড্রোন হামলার মতো কোনো ঘটনার সঙ্গে ইরান বিন্দুমাত্র জড়িত নয়। একই সঙ্গে মিশরের মাটিতে বা তাদের জলসীমায় সংঘটিত এই ধরনের সন্দেহজনক হামলাগুলোকে তিনি অত্যন্ত রহস্যময় বলে অভিহিত করেন।

 

তার মতে, প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে নির্দোষ দেশগুলোর ওপর দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার অপকৌশল গ্রহণ করেছে। পরিশেষে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের প্রতিটি দেশকে তাদের সাধারণ শত্রুদের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক ও দূরদর্শী হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

তিনি সতর্ক করে বলেন, শত্রুরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অঞ্চলে একটি জটিল ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিবেশী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং দীর্ঘস্থায়ী মতভেদ তৈরি করা।

 

আর এই হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই তারা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা অন্যের ওপর দায় চাপানোর মিথ্যা অপারেশনের নকশা প্রণয়ন ও তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করছে। তাই এই ধরনের যেকোনো উসকানিমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে, এর পেছনের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইরান।

 

- পার্সটুডে