তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ইরানের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর, নীরব ও বিপজ্জনক হুমকি হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় দেশ কাতার।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটিয়ে পুনরায় সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তিনি অবিলম্বে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কাতারকে ইসরায়েলের ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করবেন বলে এক দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
তার এই মন্তব্যটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ভয়াবহ সংঘাত ও চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত শনিবার, ১ আগস্ট, ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর একটি বিশেষ ও বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়ে বেনেট এই চাঞ্চল্যকর দাবিগুলো উপস্থাপন করেন।
ইরান এবং কাতারের শত্রুতার ধরন ও মাত্রার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, এই দুই দেশের কার্যপ্রণালীর মধ্যে কৌশলগতভাবে একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বেনেটের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান অত্যন্ত প্রকাশ্যভাবে এবং সরাসরি ইসরায়েলকে ধ্বংস করার হুমকি প্রদান করে।
যেহেতু শত্রু প্রকাশ্যে চিহ্নিত, তাই এই সরাসরি হুমকি মোকাবিলার জন্য ইসরায়েল সামরিক, মানসিক এবং কৌশলগতভাবে সর্বদা উচ্চ সতর্ক অবস্থায় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু অন্যদিকে, কাতার সম্পূর্ণ ভিন্ন, ধূর্ত ও অত্যন্ত সুকৌশলী একটি পন্থা অবলম্বন করে থাকে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে তারা প্রকাশ্যে বন্ধুভাবাপন্ন কিংবা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মধ্যস্থতাকারীর এক শান্তিকামী রূপ ধারণ করে, কিন্তু মূলত অত্যন্ত গোপনে এবং সুপরিকল্পিতভাবে ইসরায়েলের ভিত্তি দুর্বল করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বেনেটের মতে, এই ধরনের অদৃশ্য ও গোপন শত্রুতা যেকোনো প্রকাশ্য সামরিক হুমকির চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদী ও ধ্বংসাত্মক। কাতারের বিরুদ্ধে সরাসরি ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের যে বিশেষায়িত এলিট কমান্ডো ইউনিট, যা ‘নুখবা বাহিনী’ নামে সমধিক পরিচিত, তাদের গড়ে ওঠার পেছনে কাতারের বিপুল পরিমাণ ও নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক মদদ রয়েছে।
এই সুসজ্জিত নুখবা বাহিনীই মূলত ইসরায়েলের শক্তিশালী সীমান্ত প্রাচীর ভেদ করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সেই নজিরবিহীন ও মারাত্মক প্রাণঘাতী হামলা পরিচালনা করেছিল। শুধু হামাসকে বিপুল অর্থায়নই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল বিরোধী বয়ান তৈরিতে কাতারের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন বেনেট। বিশেষ করে, কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সম্প্রচার নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ফিলিস্তিনপন্থী যে তুমুল আন্দোলন ও বিক্ষোভ গড়ে উঠেছে, তার পেছনেও কাতারের সুদূরপ্রসারী আর্থিক প্রভাব, মিডিয়া প্রচারণা ও প্রচ্ছন্ন ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি জোরালো অভিযোগ করেন।
ইসরায়েলের বহির্বিশ্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি, দেশটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কাঠামোর একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতেও কাতার অত্যন্ত সুচারুভাবে অনুপ্রবেশ করেছে বলে বেনেট সমগ্র জাতিকে সতর্ক করে দেন।
এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি ইসরায়েলি রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহুল আলোচিত ‘কাতারগেট’ কেলেঙ্কারির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, তারা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কাতারের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। বেনেট অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে বর্তমানে ইসরায়েলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলমান রয়েছে।
সর্বশেষ, ইসরায়েলের বর্তমান আইনি কাঠামোর একটি বড় ও বিপজ্জনক দুর্বলতার দিকেও আঙুল তোলেন নাফতালি বেনেট। তিনি বলেন, কাতার প্রতিনিয়ত ও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং দেশের ভেতর থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষ ছড়াচ্ছে।
তা সত্ত্বেও, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের বিরুদ্ধে বা তাদের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর মূল কারণটি হলো, ইসরায়েল রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কাতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেনি। আর এই আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েই ইসরায়েলের নাগরিক হয়েও অনেকেই অত্যন্ত নির্বিঘ্নে কাতারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন, যা দেশের প্রচলিত আইনে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হচ্ছে না।
বেনেট তার সাক্ষাৎকারের উপসংহারে দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, দেশের অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ স্বার্থেই এই মারাত্মক আইনি শূন্যতা অনতিবিলম্বে দূর করা অপরিহার্য এবং কাতারকে শত্রু রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমেই কেবল ইসরায়েলের ভেতরে তাদের এই বিষাক্ত প্রভাব ও গভীর ষড়যন্ত্রের জাল চিরতরে ছিন্ন করা সম্ভব।
- দ্য টাইমস অব ইসরায়েল