শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গোনা শতাধিক ইথিওপীয় বন্দির গোপন বার্তা ও ন্যায়বিচারের আকুত

RNS News

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গোনা শতাধিক ইথিওপীয় বন্দির গোপন বার্তা ও ন্যায়বিচারের আকুত
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে চরম উৎকণ্ঠা ও মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন শতাধিক ইথিওপীয় নাগরিক। বিচারিক প্রক্রিয়ায় চরম অস্বচ্ছতা ও ন্যূনতম ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন এই অসহায় বন্দিরা।

 

সম্প্রতি ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে নিজেদের নিদারুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন তারা। তাদের অভিযোগ, কোনো আইনি সহায়তা বা আইনজীবী ছাড়াই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি মামলার বিষয়বস্তু না বুঝেই বাধ্য করা হয়েছে আরবি ভাষায় লেখা নথিপত্রে স্বাক্ষর করতে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই অন্তত ১৭ জন ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি প্রশাসন। কেবল গত সোমবারেই পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দ

 

ক্ষিণ সৌদি আরবের খামিস মুশাইত কারাগারে তিন বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছেন এক ইথিওপীয় যুবক, নিরাপত্তার স্বার্থে যার ছদ্মনাম ‘হাবতোম’। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা এই যুবক কারাগার থেকে গোপনে টেলিফোনে বিবিসিকে তার যন্ত্রণার কথা জানান।

 

 

তিনি বলেন, তারা কেবল নীরবে কাঁদতে পারেন, এমনকি কখন তাদের মৃত্যু পরোয়ানা কার্যকর হবে, সে বিষয়েও তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন। হাবতোমসহ আরও বেশ কয়েকজন বন্দি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চল থেকে পালিয়ে উন্নত জীবনের সন্ধানে জিবুতি ও ইয়েমেন হয়ে সৌদি আরবে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরপরই মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারা। বিবিসি জানিয়েছে, কেবল ওই একটি কারাগারেই প্রায় দুই শতাধিক ইথিওপীয় নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন।

 

‘দেস্তা’ নামের অপর এক বন্দি কারাগারের ভয়াবহ পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, মাত্র ৯০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি ছোট কক্ষে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। প্রচণ্ড গরম, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আতঙ্কের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।

 

কারারক্ষীরা কেবল খাবার দেওয়ার সময় দরজা খোলেন, আর কিছু জানতে চাইলে উল্টো শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। দেস্তার মতে, মৃত্যুর ভয় ও অমানবিক পরিবেশ তাদের মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাত্র দুজন ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়ায়।

 

বিশ্লেষকদের ধারণা, টাইগ্রে যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের দেশত্যাগ এবং সৌদি আরবে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগের ফলেই এই সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হাবতোমের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মাদক ‘হাশিশ’ পাচারের অভিযোগ আনা হলেও তিনি দাবি করেন, তিনি মূলত জানতেনই না কী বহন করছেন।

 

পরে বুঝতে পারেন সেটি ছিল ‘খাত’, যা আফ্রিকার শিং অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি উদ্দীপক উদ্ভিদ মাত্র। বেশি অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ওই প্যাকেট বহনে রাজি করানো হয়েছিল। বিচার চলাকালে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ বা আইনজীবী দেওয়া হয়নি। উপরন্তু, সম্পূর্ণ আরবি ভাষায় লেখা আইনি নথিতে না বুঝেই স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন তিনি। অন্যান্য বন্দিরাও প্রায় অভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এ ধরনের মামলাগুলোতে অভিযুক্তদের কোনো আইনি সহায়তা দেওয়া হয় না এবং আদালতের নথিও তাদের কাছে পৌঁছায় না। বিচার প্রক্রিয়ায় অনুবাদের সুবিধাও অত্যন্ত নগণ্য। ফলে আপিলের অধিকার থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগের কোনো সুযোগ থাকে না।

 

সংস্থাটির গবেষক ডানা আহমেদ জানান, পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার চরম অভাব রয়েছে। বন্দি বা তাদের পরিবার ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন না কখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নাদিয়া হার্ডম্যান বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই একসঙ্গে বহু মানুষের গণবিচার করা হয়েছে।

 

তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও সৌদি সরকার সাধারণত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করে যে, যথাযথ তদন্ত, বিচার, আপিল, সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন এবং বাদশাহর ডিক্রি জারির পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষার অংশ হিসেবেই এই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে রিয়াদ বরাবরই দাবি করে আসছে।

সৌদি আরবে ইথিওপীয় নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। গত এপ্রিলে তিনজন ও জুনে আরও নয়জন ইথিওপীয়র মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং ইথিওপিয়ার অর্থোডক্স চার্চের প্রধান আবুনে মাথিয়াস সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য নিজ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

 

আফ্রিকান ইউনিয়নের মানবাধিকার কমিশনও আদ্দিস আবাবাকে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করেছে। এ পরিস্থিতিতে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৩ জুলাই এক বিবৃতিতে জানায়, নাগরিকদের বিষয়ে তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সংকট সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ইথিওপীয় নাগরিক সৌদি বাদশাহর সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।