ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সৌদি যুবরাজ ও দেশটির শাসনকার্যের মূল রূপকার মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপে এই নিবেদন জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের মাত্রা তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে রিয়াদ আশঙ্কা করছে, তেহরানের সঙ্গে নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের সূচনা হলে তা পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে পারে।
সেই সাথে রিয়াদের বহুল আলোচিত ও মেগা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা 'ভিশন ২০৩০'-এর বাস্তবায়নকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর ব্যাপারে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
কিন্তু রিয়াদ এই পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সৌদি নেতৃত্বের শঙ্কা হলো, ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো বড় ধরনের আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তেহরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ওপর কোনো হামলা চালানো হলে কেবল ইসরায়েল নয়, বরং আঞ্চলিক মার্কিন মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাত ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে কঠোর সামরিক জবাব দেওয়া হবে।
সৌদি আরবের এই সামরিক শঙ্কা ও কৌশলগত অবস্থানের মূল ভিত্তি রয়েছে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার ওপর। মার্কিন সাময়িকী নিউজউইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবের সাবেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ বিন ফারাহ আল-শায়া উল্লেখ করেন যে, 'ভিশন ২০৩০' কেবল একটি সাধারণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা নয়।
বরং এটি তেলনির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্যময় ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি সৌদি আরবকে বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সর্বাত্মক জাতীয় সংগ্রাম।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পারস্য উপসাগরজুড়ে টেকসই রাজনৈতিক ও সামরিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য, যা যেকোনো আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে। একই সাথে, ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত থেকেও রিয়াদ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিক্ষা লাভ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের শীর্ষ বিশ্লেষক ডানা স্ট্রোল বিশ্লেষণ করে বলেছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ পদক্ষেপের পরও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হুমকি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বছরের পর বছর চলা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব এটি অনুধাবন করেছে যে, কৌশলগত শত্রু মোকাবিলায় কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনই সমাধান নয়। ইরান থেকে পাওয়া উন্নত সামরিক সহায়তা এবং ইয়েমেনে তাদের শক্ত অবস্থানের কারণে হুথিরা যেকোনো সময় সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তাই নতুন করে ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো অঞ্চলকে অশান্ত করলে তা রিয়াদের জাতীয় নিরাপত্তাকে পুনরায় ঝুঁকিপূর্ণ করবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই গভীর সংকট নিরসনে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত টেলিফোন সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো সরাসরি হামলায় কোনো আঞ্চলিক দেশ যদি তাদের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তবে তেহরান তাকে শত্রুপক্ষের অংশ হিসেবে গণ্য করবে এবং উপযুক্ত জবাব দেবে।
অন্যদিকে, সংঘাত প্রশমনে এবং বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদ ও উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে কাতার এবং ওমান পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদানের পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার তাগিদে এই দৌত্য অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র হয়েও নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সৌদি আরব এখন যুদ্ধ এড়ানোর কৌশলকেই সর্বাগ্রে স্থান দিচ্ছে।