দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সংলাপ শুরু করার বিষয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, ইরানি কর্মকর্তারা তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
তেহরানের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সোমবার তো নয়ই, এমনকি নিকট ভবিষ্যতেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা তাদের নেই।
এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক অচলাবস্থা যে সহসাই কাটছে না, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আবারও প্রমাণিত হলো। এর আগে, গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি উড়োজাহাজ ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে জানিয়েছিলেন যে, ৩ আগস্ট, সোমবার থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের শীর্ষ সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনা পুনরায় শুরু হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেই সময় আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, এবারের সম্ভাব্য এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের পাশাপাশি কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ ও বাধামুক্ত চলাচলের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
তার এই বক্তব্যের পর বিশ্বজুড়ে এক ধরনের কূটনৈতিক আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আশাবাদী দাবির চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ইরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি গণমাধ্যমকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, ৩ আগস্ট সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের আলোচনা শুরু হচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, অদূর ভবিষ্যতেও এমন কোনো কূটনৈতিক আলোচনা বা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সূচি তাদের কাছে নির্ধারিত নেই। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আসন্ন দিনগুলোতে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো বিদেশি আলোচক প্রতিনিধি দলকে তেহরানে আতিথেয়তা প্রদান করার কিংবা নিজেদের কোনো প্রতিনিধি দলকে আলোচনার জন্য বিদেশে পাঠানোর কোনো কর্মসূচি বা পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেনি।
ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দেশটির শীর্ষ কূটনীতিকের অনুপস্থিতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের প্রধান আলোচক দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি ছাড়া দলের বাকি সব সদস্য বর্তমানে ইরানেই অবস্থান করছেন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে রাষ্ট্রীয় বা কূটনৈতিক কাজে দেশে নেই, যা যেকোনো উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও বড় বাধা। এই বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি বর্তমানে একটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকে অবস্থান করছেন। চলতি সপ্তাহের মধ্যে তার দেশে ফিরে আসার কোনো ধরনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ওই পদস্থ কর্মকর্তা রয়টার্সকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। এর মাধ্যমে ইরান মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিকে কৌশলগতভাবে এবং বাস্তবতার নিরিখে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে নিজের গভীর আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সে সময় বলেছিলেন যে, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো মুহূর্তে আলোচনা শুরু করার জন্য মার্কিন প্রশাসন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের সঙ্গে তিনি কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে চান কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
ট্রাম্প বলেন, তিনি অবশ্যই একটি চুক্তির পক্ষে, কারণ তিনি কোনো রক্তপাত বা মানুষ হত্যা করতে চান না। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, যদি শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে কোনো গঠনমূলক চুক্তি না হয়, তবে বহু মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই প্রত্যাশা করে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট একদিকে যেমন আলোচনার বার্তা দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, অন্যদিকে তেমনি চুক্তিতে না পৌঁছালে ভয়াবহ পরিণতির প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়ে রাখছেন।
তবে ইরান তাদের নিজস্ব অবস্থানে অনড় থেকে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের কোনো চাপের মুখে বা তাড়াহুড়ো করে তারা আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার স্বার্থে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই বিপরীতমুখী ও অনমনীয় অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।