শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সাইবার প্রযুক্তি ও নির্বাচনী হস্তক্ষেপ

বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান মিত্র হয়ে উঠছে ইসরাইল !

RNS News

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান মিত্র হয়ে উঠছে ইসরাইল !
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজরদারি প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ইসরাইল ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ও রাজনৈতিক শক্তির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর দাবি উঠে এসেছে।

 

এই প্রতিবেদনে স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, আধুনিক সাইবার প্রযুক্তি এবং বেসরকারি নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এক সুপরিকল্পিত সমন্বয়ের মাধ্যমে ইসরাইল বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব কৌশলগত প্রভাব ও আধিপত্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে চলেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে ক্ষমতার অপপ্রয়োগকারী সরকারগুলোর সঙ্গে তাদের এই ক্রমবর্ধমান সখ্যতা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের বিতর্কিত স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ এবং তাদের তৈরি বহুল আলোচিত ‘পেগাসাস’ সফটওয়্যার দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ব্যবহার করে আসছে।

 

মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগ রয়েছে যে, এই অত্যাধুনিক সাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মূলত স্বাধীন সাংবাদিক, সোচ্চার মানবাধিকারকর্মী, বিরোধী দলের শীর্ষ রাজনীতিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ওপরও ব্যাপক ও বেআইনি নজরদারি চালানো হয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এই ভয়াবহ হাতিয়ারটি এখন মূলত স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোতে ভিন্নমত দমনের এক অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

 

ইসরাইলি রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে এসব বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গোপন আঁতাতের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, এনএসও গ্রুপের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা শালেভ হুলিও ২০১৩ সালে পানামা সফরের সময় ইসরাইলের সরকারি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন।

ওই সফরের সময় তিনি পানামায় অবস্থিত ইসরাইলি দূতাবাসে অবস্থান করেন। প্রতিবেদনে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, এর আগে ২০১২ সালে পানামা সরকারের কাছে পেগাসাস সফটওয়্যার বিক্রির একটি বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে হুলিও সরাসরি ও প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সুনির্দিষ্ট ঘটনাটি একটি বড় ধরনের ইঙ্গিত দেয় যে, এনএসও গ্রুপসহ ইসরাইলের বিভিন্ন নজরদারি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল মুনাফালোভী বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে না; বরং তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরাইলি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নেও বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এই ধরনের নজরদারি প্রযুক্তির ভয়াবহতা নিয়ে প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এনএসও গ্রুপের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু ব্যবহারকারীদের মোবাইল ডিভাইস থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম, তাই সাইবার বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ বা কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

গত এক দশক ধরে ইসরাইলি সাইবার প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের কোনো কমতি নেই। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই পেগাসাসের মতো নজরদারি সফটওয়্যার ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এবং এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

 

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে নজরদারি নয়, বরং বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগটি বর্তমান সময়ে আরও বড় ও ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, কলম্বিয়া ও হন্ডুরাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরাইলি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, স্বয়ংক্রিয় বট নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা এবং জনমতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে।

 

এসব সাইবার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হিসেবে ইসরাইল-সমর্থক রাজনৈতিক প্রার্থীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া এবং এর বিপরীতে ফিলিস্তিনপন্থী বা ইসরাইল-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অপতৎপরতা যেকোনো দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটব্যবস্থার জন্য এক নজিরবিহীন ও অস্তিত্বসংকট সৃষ্টিকারী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

 

এই প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকাকে ইসরাইল-সমর্থিত রাজনৈতিক ও সাইবার তৎপরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী সরকার এবং হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের মধ্যে এক কথিত ও গোপন সমন্বয়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে বামপন্থী সরকারগুলোকে দুর্বল করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল।

 

এছাড়া, ব্রাজিলের রাজনীতিতেও ইসরাইলের হস্তক্ষেপের বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রচারণায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সমর্থনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রবল ধারণা পোষণ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের আগে ব্যাপক অনলাইন প্রচারণা ও নিখুঁত সাইবার কৌশলের মাধ্যমে সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক জোরদার চেষ্টা চালানো হতে পারে।

 

প্রতিবেদনের শেষাংশে ইসরাইলের এই আগ্রাসী সাইবার ও কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনের মূল কারণটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান আগ্রাসন ও গণহত্যার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের প্রতি সাধারণ জনসমর্থন ও সহানুভূতি অভাবনীয়ভাবে কমে গেছে।

 

বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়া ইসরাইল এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্র বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর সেই লক্ষ্যেই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পুনরায় শক্তিশালী করতে ইসরাইল এখন আরও সক্রিয়ভাবে উন্নত সাইবার প্রযুক্তি, রাষ্ট্রীয় কূটনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক সমন্বিত কৌশল ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে দৃঢ়ভাবে দাবি করা হয়েছে।

 

 

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডলইস্ট আই’-এর সূত্রে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং গভীর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসরাইল সরকার বা অভিযুক্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

 

- মিডলইস্ট আই