একই সাথে, এ সময় রিয়াদে অবস্থানরত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই বৈঠকটি এক নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই সফরসূচির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দেশটির যোগাযোগ পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এই রিয়াদ সফরের তথ্য প্রকাশ করেন।
যদিও আঙ্কারার পক্ষ থেকে আলোচনার বিশদ রূপরেখা বা নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবে দেশটির শীর্ষ কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলাই হবে এই যোগাযোগের মূল ভিত্তি।
বর্তমানে পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সৌদি আরবে উপস্থিতি বৈশ্বিক অঙ্গনে এক বিশেষ বার্তা বহন করছে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সে দেশের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে সাথে নিয়ে তিন দিনের এক সরকারি সফরে বৃহস্পতিবারই সৌদি আরবে পৌঁছান।
কাতারভিত্তিক বার্তা সংস্থা আল জাজিরার তথ্য অনুসারে, রিয়াদে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী এই তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সর্বশেষ রিয়াদ সফরের সময়ও তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক অক্ষ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তখনকার সেই প্রাথমিক আলোচনা এবার ত্রিপক্ষীয় রূপ নিতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যের বরাতে জানা গেছে, এই তিন শীর্ষ নেতার মধ্যকার আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
বিশেষ করে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক উত্তেজনা এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সাধারণ কৌশল প্রণয়নই এই যৌথ আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয় দেশই কৌশলগতভাবে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এই আকস্মিক রিয়াদ সফরের সময়কালটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অর্থবহ।
সম্প্রতি লোহিত সাগর, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় বাণিজ্যিক নৌচলাচল নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য সৌদি আরব একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগের ঘোষণা দেয়।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে ঘোষিত এই বৈশ্বিক জোটে ইতোমধ্যেই তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের ১৪টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়ে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করার এই রূপরেখা বাস্তবায়নে তিন দেশের মধ্যকার ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিরতা ও পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতার মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রার সূচনা করতে পারে।
বিশেষ করে আঙ্কারা, রিয়াদ ও ইসলামাবাদের এই নতুন যোগাযোগ অক্ষ যদি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক বা কৌশলগত জোটে পরিণত হয়, তবে তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আঞ্চলিক সংকটের শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ নতুন কোনো শক্তির ভারসাম্য তৈরি করবে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। বিশ্ব কূটনৈতিক মহল এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, রিয়াদের এই যৌথ আলোচনার পর ঠিক কী ধরনের আনুষ্ঠানিক যৌথ ঘোষণা বা সমঝোতা সামনে আসে।