এর আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সাময়িকভাবে প্রশমিত হওয়ার আশায় তেলের মূল্যে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি বাজারের সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি পুনরায় পূর্ণাঙ্গ ও অবাধে চালু হওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া ঘোর অনিশ্চয়তাই প্রধানত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় দুপুরের দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ২৪ মার্কিন ডলারে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৪২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে অবস্থান করছে ৭৭ দশমিক ৭১ ডলারে।
এর আগে বৃহস্পতিবারের ব্যবসায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এক লাফেই ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। মূলত ইরানি সংসদে একটি খসড়া আইন পর্যালোচনার সংবাদের পরই বাজারে গভীর উদ্বেগের সঞ্চার হয়, যেখানে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্পর্কিত জাহাজগুলোর চলাচলের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাত শুরুর আগে সমগ্র বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়মিত এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হতো।
তাই বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই নৌপথটির অবাধ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। সপ্তাহের শুরুর দিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার প্রত্যাশায় জ্বালানি তেলের বাজারে দরপতনের একটি ধারা লক্ষণীয় হয়েছিল, যার ফলে পুরো সপ্তাহের হিসাব বিবেচনা করলে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-উভয় বেঞ্চমার্কেই প্রায় ৮ শতাংশ মূল্যহ্রাসের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে নতুন নতুন শর্ত এবং তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের সংবাদ প্রকাশের সাথে সাথেই বৈশ্বিক বাজার আবারও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লিন ইয়ে এ প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের প্রক্রিয়া পুনর্গঠনে ইরানের খসড়া পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বাজারে নতুন এই অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।
বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কোনো প্রকার বাধা ছাড়া স্বাভাবিক যাতায়াত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ইরান সেখানে একটি শর্তসাপেক্ষ ও তাদের দ্বারা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক করিডোর গড়ে তুলতে চাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের মনে প্রবল আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
এর পাশাপাশি তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পরিবাহিত পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি বা শুল্ক হিসেবে আদায় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে ইরানি প্রশাসন।
অন্যদিকে, একই অঞ্চলের নিরাপত্তার অজুহাতে ওমানও প্রায় ৩ শতাংশ অতিরিক্ত ফি আদায়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চালাচ্ছে, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ফি আরোপের এই ধরনের পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে।
শিল্প খাতের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, মার্কিন বিদ্যমান কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জাহাজগুলোর জন্য অর্থ পরিশোধ ও কঠোর বীমা শর্তের কারণে তেহরানের এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর করা মোটেও সহজসাধ্য হবে না।
এর ওপর আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সর্বশেষ সামরিক তৎপরতা। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে যে তারা সৌদি আরবের মারিব ও হাদরামাউত অঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তু লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করেছে, যা পুরো অঞ্চলের উত্তেজনাকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, ইরানের সাথে চলমান কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন খুব দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী সমাধানের দিকে পৌঁছাতে পারে।
এমন একটি ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন কর্মসংস্থান বা পে-রোলস প্রতিবেদনের ওপর। শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তাদের পরবর্তী সুদের হার সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ করবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুদের হার আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা বৈশ্বিক ভোক্তা ব্যয় ও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদাতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন সামুদ্রিক শুল্কের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দোলাচল-সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে নিকট ভবিষ্যতে কোনো স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সুস্পষ্ট সংকেত মিলছে না।