শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি

'একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা' নীতিতে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

'একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা' নীতিতে তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক সামরিক সমীকরণে এক যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক মেরুকরণের সূচনা হলো। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র—সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান একটি অভূতপূর্ব যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবদ্ধ হয়েছে।

 

পবিত্র নগরীর নামে নামাঙ্কিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' নামের এই ঐতিহাসিক সমঝোতার মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সুরক্ষার চরম নিশ্চয়তা প্রদান। এই চুক্তিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা শক্তির দিক থেকে হামলা হলে, তা অন্য দুটি দেশের ওপরও সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

মূলত এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সামরিক ও কূটনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটল, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। শুক্রবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ পর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর এই যুগান্তকারী চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।

 

বিশ্ব রাজনীতির অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উত্তেজনাকর এক সময়ে এই তিন শীর্ষ নেতার এমন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদান এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় এই চুক্তি একটি সুদূরপ্রসারী এবং সাহসী পদক্ষেপ।

 

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেই বিবৃতিতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় এই চুক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি দুর্ভেদ্য, সম্মিলিত ও যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে একেবারে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, চুক্তিবদ্ধ তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর যদি কোনো সশস্ত্র হামলা বা আগ্রাসন চালানো হয়, তবে বাকি সব কটি দেশ তা নিজেদের ওপর প্রত্যক্ষ হামলা হিসেবেই গণ্য করবে এবং সম্মিলিতভাবে সেই আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেবে।

 

এছাড়া, এই যুগান্তকারী চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রকে আরও সুদৃঢ় করার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য একেবারেই অভাবনীয়। কারণ, এই চুক্তিটি বিশ্বের তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত রাষ্ট্রকে একই সামরিক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে।

 

একদিকে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং বিশাল ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীর অধিকারী দেশ পাকিস্তান। অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী, বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতার অধিকারী ও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব।

 

তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী এবং ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত ভূ-কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ তুরস্ক, যাদের আধুনিক সমরাস্ত্র প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

 

পারমাণবিক শক্তি, বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির এমন অভূতপূর্ব মেলবন্ধন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন ও শক্তিশালী ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করবে বলে দৃঢ়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এখন থেকে এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর কেউ আগ্রাসন চালানোর পরিকল্পনা করলে, তাকে সম্মিলিত এই অপরিমেয় শক্তির মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা নবগঠিত এই 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'টিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর গঠনতন্ত্রের সাথে সরাসরি তুলনা করছেন। ন্যাটোর ঐতিহাসিক সনদের 'আর্টিকেল-৫' বা ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ঠিক একই ধরনের যৌথ প্রতিরক্ষার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সদস্যভুক্ত যেকোনো একটি দেশ হামলার শিকার হলে পুরো জোট সেটিকে নিজেদের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে এবং আক্রান্ত দেশের সহায়তায় সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়।

 

সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যকার এই নতুন চুক্তিটিও সম্পূর্ণভাবে সেই একই কাঠামোর আদলে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত একটি বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলে সম্পূর্ণ নতুন এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি হলো।

 

বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর অব্যাহত টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক চরম অস্থিতিশীলতার এই সংকটময় যুগে তিনটি শক্তিশালী মুসলিম দেশের এমন সামরিক ও কৌশলগত ঐক্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত গতিপথকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে।