শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের সাহায্যে এক কাতারে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি অধিকারকর্মীরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের সাহায্যে এক কাতারে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি অধিকারকর্মীরা
ছবি: AA

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা অঞ্চলে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এক বিরল ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। টানা পাঁচ দিন ধরে নিজ বাসভূমে অবরুদ্ধ থাকা তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের সাহায্যে এবার স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি রাজপথে নেমেছেন বিদেশি নাগরিক এবং বামপন্থি ইসরায়েলি মানবাধিকারকর্মীরা।

 

অবরুদ্ধ ওই পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সংহতি জানাতে এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার লক্ষ্যে শুক্রবার তারা এক প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই খবর প্রকাশ করেছে, যেখানে মানবাধিকারের পক্ষে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের এই যৌথ অবস্থানকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার নাবলুস শহরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত কুসরার রাস আল-আইন এলাকায় সকাল থেকেই অধিকারকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল অবরুদ্ধ অবস্থায় মানবেতর দিন কাটানো তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের সদস্যদের শারীরিক খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া।

 

তবে মানবাধিকারকর্মীদের এই শান্তিপূর্ণ ও মানবিক পদযাত্রায় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্য। সেনাসদস্যরা এলাকাটিকে একটি ‘নিষিদ্ধ সামরিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের সামনের দিকে অগ্রসর হতে কঠোরভাবে নিষেধ করে।

 

সামরিক বাহিনীর কড়া নজরদারি ও বাধা সত্ত্বেও, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর কাছে শেষ পর্যন্ত সামান্য কিছু খাদ্য, পানি ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিতে সক্ষম হন।

 

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার মূল সূত্রপাত হয় যখন রাস আল-আইন এলাকায় ওই নির্দিষ্ট ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ির ঠিক বাইরে উগ্র ইসরায়েলি দখলদাররা অবৈধভাবে একটি অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করে।

 

পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলে ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দখলদারদের সেই অস্থায়ী তাঁবুটি সরিয়ে দেয়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে তাঁবু সরানো হলেও ওই নিরীহ ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর ওপর থেকে নিষ্ঠুর অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি।

 

বরং তাদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে কঠোর সামরিক বেষ্টনী তৈরি করা হয় এবং সেখানকার নিরপরাধ বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচলের ওপর চরম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কুসরা শহরজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাঁজোয়া যান ও সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়মিত টহল এখনও অব্যাহত রয়েছে।

 

এর আগে শহরটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর এক বিশাল সামরিক অভিযানের সময় অন্তত ১৬টি ফিলিস্তিনি বসতবাড়ি জোরপূর্বক দখল করে সেগুলোকে সামরিক ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে স্থানীয় শহর পরিষদের প্রধান আব্দুল আজিম ওয়াদি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছেন।

 

অবশ্য বৃহস্পতিবার দখল করা ওই বাড়িগুলো থেকে শুক্রবার সকালে সেনারা সাময়িকভাবে সরে যায়। অবরুদ্ধ পরিবারগুলোর অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত শোচনীয় ও অমানবিক। জানা গেছে, গত রোববার থেকে কয়েক ডজন উগ্র ইসরায়েলি দখলদার এই সর্বাত্মক অবরোধের সূচনা করে।

 

তারা কেবল ফিলিস্তিনিদের বাড়ির বাইরে অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং যাতায়াতের প্রধান সড়কগুলোও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

এমনকি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও পানির লাইনেরও। সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, মূলত ফিলিস্তিনিদের নিজ বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার এক দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গত প্রায় চার মাস ধরে এই জমি দখলের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা।

 

চরম অমানবিক এই অবরোধের মুখে পরিবারগুলো তাদের পৈতৃক সম্পত্তি হারানোর গভীর আশঙ্কায় বিনিদ্র রজনী পার করছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর এ ধরনের নিপীড়নের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।

 

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিক এবং তাদের সহায়-সম্পত্তির ওপর ইসরায়েলি দখলদারদের হামলার মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সনদ চরমভাবে লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখল এবং তাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো সুস্পষ্ট আভাস মিলছে না।

 

আনাদোলু