শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ : আইআরজিসি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ : আইআরজিসি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও প্রবল উত্তাপ ছড়িয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ও স্পর্শকাতর এই নৌপথের ওপর নিজেদের সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ থাকার জোরালো দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিবৃতি ও দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ইরানের এই অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান বাস্তবতা ওয়াশিংটনের কোনো দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতিই সেখানে শেষ কথা।

 

এই কঠোর বার্তার মধ্য দিয়ে ইরান মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য, কৌশলগত অবস্থান ও নিশ্ছিদ্র শক্তিমত্তার বিষয়টি নতুন করে গোটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এই বিবৃতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা প্রেস টিভির বরাত দিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানা যায়, আইআরজিসির নৌবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী উজমায়ি সম্প্রতি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সুদৃঢ় ও অবিচল অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও বহিরাগতদের জন্য বন্ধ রয়েছে এবং এর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার সম্পূর্ণ অটুট ও সুনিশ্চিত।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দাবি ও আশ্বাসের তীব্র সমালোচনা করে এই জ্যেষ্ঠ নৌ কমান্ডার বলেন, আমেরিকার রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থে কী ধরনের বিবৃতি দিচ্ছে, তা দিয়ে এই অঞ্চলের প্রকৃত বাস্তবতা কোনোভাবেই পরিমাপ করা যাবে না।

 

এখানকার বিস্তীর্ণ নৌপথে মূলত কারা আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তা সরাসরি মাঠের সামরিক পরিস্থিতি ও শক্তির মহড়া পর্যবেক্ষণ করলেই বিশ্বের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

 

মূলত, ইরান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, তাদের নিরবচ্ছিন্ন সামরিক উপস্থিতির কারণেই হরমুজ প্রণালির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই সুরক্ষিত রয়েছে এবং বাইরের কোনো পরাশক্তির পক্ষে বলপ্রয়োগ করে এই নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া কখনোই সম্ভব নয়।

 

হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও স্পর্শকাতর একটি আন্তর্জাতিক নৌপথে আইআরজিসির নজরদারির মাত্রা ঠিক কতটা নিবিড় এবং আধুনিক, সেটিও সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে রিয়ার অ্যাডমিরাল উজমায়ির বক্তব্যে।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান যেকোনো দেশের, যেকোনো ধরনের ক্ষুদ্র বা বৃহৎ নৌ তৎপরতাই আইআরজিসির চৌকস নৌযোদ্ধাদের তীক্ষ্ণ নজরদারি এড়াতে সক্ষম নয়।

 

রাডার, ড্রোন এবং অত্যাধুনিক টহল জাহাজের মাধ্যমে পুরো এলাকার প্রতিটি জলবিন্দু বর্তমানে ইরানের নিবিড় ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে। মূলত এর মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের এই সতর্কবার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, পারস্য উপসাগরে ইরানের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে বা তাদের সতর্ক চোখ এড়িয়ে কোনো ধরনের সামরিক বা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব একটি বিষয়।

 

আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং নিবেদিতপ্রাণ নৌসেনাদের মাধ্যমে আইআরজিসি এই প্রণালিতে একটি অভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যা পারস্য উপসাগরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ রুখে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

সামরিক এই টানটান উত্তেজনার পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতি ও নতুন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত পেজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

 

তিনি মনে করেন, পারস্য উপসাগর ও এর আশেপাশের অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নতুন একটি নির্ভরযোগ্য শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘হরমুজ মেকানিজম’ বা হরমুজ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

পশ্চিমা সামরিক নির্ভরতা থেকে চিরতরে বেরিয়ে এসে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজস্ব বলয়ে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন তিনি।

 

তাঁর মতে, বাইরের পরাশক্তির অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই কেবল এই অঞ্চলের প্রকৃত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। মোহাম্মদ মোখবের তাঁর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও মিত্রদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতির তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদান করতে যুক্তরাষ্ট্র যে চরমভাবে ব্যর্থ ও অক্ষম, তা ইতিমধ্যে একাধিক সংঘাতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

 

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটনের দেওয়া সামরিক নিশ্চয়তার ওপর আর কোনোভাবেই নির্ভর করা যায় না বলে তিনি মনে করেন। তাই আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবমুক্ত থেকে এই অঞ্চলে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, টেকসই এবং অর্থনৈতিক-নিরাপত্তাভিত্তিক ‘হরমুজ মেকানিজম’ বাস্তবায়ন করাই হবে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা বা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে যৌক্তিক ও কার্যকর পন্থা।

 

এই নতুন ও যুগান্তকারী ব্যবস্থার অধীনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার অতীত বিভেদ ভুলে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

সর্বোপরি, ইরানের ন্যায্য শর্তগুলো যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা পশ্চিমা বিশ্ব মেনে না নেয়, তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, সে বিষয়েও এক প্রচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতার এই উপদেষ্টা।

 

তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, ইরানের শর্তাবলি পূরণ করা না হলে বর্তমান সংঘাত বা স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতার যে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কৌশল রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির সমীকরণে এক বিশাল ও অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

 

এমনটি ঘটলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন আক্রমণাত্মক কৌশল এক নজিরবিহীন বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিতে পারে, যা সামাল দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

 

সার্বিকভাবে, আইআরজিসির নৌ কমান্ডারের এই প্রত্যক্ষ সামরিক হুঁশিয়ারি এবং সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টার এই ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যেকোনো ধরনের চরম পদক্ষেপ গ্রহণে মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

পশ্চিমা শক্তির যেকোনো ধরনের চাপ বা সামরিক উপস্থিতিকে তারা সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় রাষ্ট্রগুলোর হাতেই ন্যস্ত করার যে ‘হরমুজ মেকানিজম’-এর ধারণা তারা জোরালোভাবে প্রচার করছে, তা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে আরও বেশি কোণঠাসা করে তুলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

 

হরমুজ প্রণালির এই চলমান সংকট এবং ইরানের এই আপসহীন ও অনমনীয় অবস্থান শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোকে কূটনীতির টেবিলে নতুন করে নিজেদের নীতি মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে কি না, সেটিই এখন বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- প্রেস টিভি