এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া প্রতিহত করার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর নতুন করে আরোপিত অন্যায্য ও ভিত্তিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য একটি কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে শীর্ষস্থানীয় ইরানি এবং ইরাকি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর এই বক্তব্যটি প্রচার করেছে, যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাগদাদের ওই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে গালিবাফ মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উপস্থিত ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মুসলিম দেশগুলোর বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শিল্পের কাঁচামালের দিকে সতর্ক দৃষ্টি দিলেই খুব সহজে অনুধাবন করা যায়, পশ্চিমা আধিপত্যকামী শক্তিগুলো মূলত নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এগুলো লুট করতে চায়।
তাদের এই একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার ও লুণ্ঠনের প্রক্রিয়াকে সমূলে প্রতিহত করতে হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও অন্যায্য নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাব সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে তা সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠার জন্য এখন থেকেই সম্মিলিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
ইরানের এই প্রভাবশালী নেতা তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে নিজেদের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইরান এবং ইরাকের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে অবতীর্ণ হয়ে তারা কখনোই তাদের কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। সামরিক ময়দানে নিজেদের এই চরম ব্যর্থতা ও হতাশা থেকেই তারা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে।
বর্তমানে তারা এই অঞ্চলের স্বাধীন দেশগুলোর ওপর সুপরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করছে এবং একই সঙ্গে এক ভয়ংকর মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করছে। তাদের এই হীন কূটচালের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের অনুগত হতে বাধ্য করা।
এই অসম অর্থনৈতিক যুদ্ধ সফলভাবে মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নিবিড় পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন গালিবাফ। তিনি উপস্থিত সবাইকে দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, একটি রাষ্ট্রের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
দেশের অর্থনীতি দুর্বল হলে তার অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এই রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে রেখে তিনি ইরাক ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
তার সুচিন্তিত মতে, উভয় দেশেরই উচিত নিজেদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও যৌথ বিনিয়োগের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি করা, যাতে বাইরের কোনো আধিপত্যকামী শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা স্থায়ীভাবে হ্রাস পায়।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও কৌশলগত প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন ইরানের স্পিকার। তিনি দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
এর একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে যাবতীয় আমদানি-রপ্তানি ও লেনদেনের ক্ষেত্রে উভয় দেশের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করার প্রস্তাব দেন তিনি। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন মুদ্রার আধিপত্য হ্রাস করার এই কৌশলটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাবকে অনেকাংশে ম্লান করে দিতে সক্ষম হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে।
গালিবাফের এই কঠোর ও সময়োপযোগী বার্তার ঠিক একদিন আগে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ওপর এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর ও সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
এই নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত রূপরেখা আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান। মার্কিন অর্থমন্ত্রীর দাবি, এই কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেবে।
এর ফলে ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে আরও বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে গালিবাফ কেবল ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারই নন, বরং তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বিভিন্ন পরোক্ষ আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
তার মতো একজন শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকের মুখ থেকে এমন কড়া হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। এই পরিস্থিতিতে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোন দিকে ধাবিত করে, তা এখন গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়।