তেহরানে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে ইরানি প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, বলপ্রয়োগ বা সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অর্থপূর্ণ সংলাপ এবং সুনির্দিষ্ট সমঝোতার ভিত্তিতে অগ্রসর হলে বিদ্যমান যাবতীয় সংকট সমাধান করা এবং তেহরানের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির বরাতে প্রকাশিত এই বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াশিংটনকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানানো হয়। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, ইরান বা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্বার্থের পাশাপাশি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার খাতিরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না কোনো ধরনের কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।
বিশেষ করে ইসরায়েলের চলমান নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক আগ্রাসনকে উসকে দেওয়ার নীতি থেকে ওয়াশিংটনকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি। নিজ দেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরান কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ কিংবা রক্তপাত চায় না; তবে আক্রান্ত হলে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিজেদের মাতৃভূমি ও অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ কোনো জাতিকে নতজানু হতে বাধ্য করার সামর্থ্য বিশ্বের কোনো পরাশক্তির নেই। ফলে যেকোনো ধরনের সামরিক হুমকি কিংবা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের জনগণ, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করানো অসম্ভব।
এ সময় তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইহুদিবাদী শক্তি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার সংহতি বিনষ্ট করে অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, যা প্রতিহত করতে সব ইসলামি দেশের মধ্যে সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও অর্থনৈতিক বৈরিতার প্রেক্ষাপটে দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ক্ষতি এবং উত্তরণের চিত্র তুলে ধরেছেন তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ-সাদেক মোতামেদিয়ান। সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, অতীতে বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ ও নৌ অবরোধ কার্যকর করা হয়েছিল, যা স্বাভাবিক রাষ্ট্র পরিচালনায় এক নজিরবিহীন ও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সেই কঠিন সময়ে তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছিল। বিশেষ করে তেহরান প্রদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ খাতের এক হাজার দুই শতাধিক স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে সংকট সত্ত্বেও বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস এবং টেলিযোগাযোগের মতো মৌলিক নাগরিক পরিষেবা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পুনর্নির্মাণ ও সচল করতে সক্ষম হয় রাষ্ট্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজ এজেন্সি।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে তারা জানায়, চলতি ইরানি বছরের প্রথম চার মাস অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২১শে মার্চ থেকে ২২শে জুলাইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই আয় জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত তেল রাজস্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও এই পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সরকারের আগামী মাসগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান সরকার জানিয়েছে, তারা দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নীতিগত বিবৃতিতে তেহরান নিশ্চিত করেছে যে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে কূটনীতি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কূটনৈতিক আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও অপরাজেয় করে তোলার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
একই সাথে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় উৎপাদনের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দেশটির সরকার।