তবে পশ্চিমা দেশগুলোর গণমাধ্যমে প্রচারিত এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার-ইন-চিফের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাদের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের নব্বই শতাংশেরও বেশি বর্তমানে সম্পূর্ণ অক্ষত ও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও আরব বিশ্বের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিন-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই স্পর্শকাতর তথ্য নিশ্চিত করেন। এই বিবৃতি এমন এক সময়ে জনসমক্ষে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সাম্প্রতিক দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় এক চরম ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে।
আল-মায়াদিনকে দেওয়া ওই বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাকদি ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন নেটওয়ার্কের অভাবনীয় স্বনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বিস্তারিতভাবে জানান, দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও পাহাড়বেষ্টিত স্থানে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপন ভূগর্ভস্থ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো এখনো তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। এই সামরিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে দিনরাত অত্যন্ত কার্যকর হারে ও দ্রুতগতিতে অত্যাধুনিক সব ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হচ্ছে।
সামরিক অভিযান ও পাল্টা আক্রমণগুলোতে যে পরিমাণ সমরাস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, দেশীয় প্রযুক্তিতে পরিচালিত এই নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেই ঘাটতি মুহূর্তের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলশ্রুতিতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও আন্তর্জাতিক নানামুখী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেহরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা আগের মতোই শক্তিশালী, দুর্ভেদ্য ও অক্ষুণ্ণ রয়েছে বলে জোরালো দাবি করেন এই বর্ষীয়ান শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক কিছু বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন খোদ হোয়াইট হাউসের পূর্ববর্তী দাবিগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করা হয়েছিল যে, সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত মিত্রবাহিনীর সামরিক অভিযানগুলোর মাধ্যমে তারা সফলভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানী ও গভীর বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে এই সরকারি দাবির সত্যতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। ওইসব প্রতিবেদনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনীর সামরিক হামলাগুলো ইরানের শক্তিশালী, সুরক্ষিত এবং বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক এবং ড্রোন উৎক্ষেপণের প্ল্যাটফর্মগুলোকে কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি; বরং এই হামলাগুলো কার্যত সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
বরং, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনগুলোতে উল্টো একটি ভিন্ন ও ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই ভূরাজনৈতিক ও সামরিক সংঘর্ষের ফলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা মজুদে ব্যাপক ও আশঙ্কাজনক মাত্রায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
পেন্টাগন ও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের ধারাবাহিক, অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উচ্চস্তরের প্রতিরোধী বা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত বেশি এবং সময়সাপেক্ষ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে তাদের কারখানাগুলোতে যে গতিতে নতুন করে এসব প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করতে সক্ষম, তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে ও ব্যাপক হারে যুদ্ধক্ষেত্রে মজুতকৃত অস্ত্র ফুরিয়ে যাচ্ছে।
সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং নতুন উৎপাদনের মধ্যকার এই বিশাল ও ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের ওপর এক অকল্পনীয় কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদেরা মনে করছেন, পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের সুরক্ষা প্রদান এবং শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান উত্তেজনায় দুই পক্ষের অস্ত্র সক্ষমতা ও মজুতের এই তুলনামূলক চিত্র বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।