শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন শিক্ষার্থীদের কাছে ইসরায়েল এখন 'শিশু হত্যাকারী' রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম

মার্কিন শিক্ষার্থীদের কাছে ইসরায়েল এখন 'শিশু হত্যাকারী' রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং বর্তমানে তাদের কাছে ইসরায়েল শব্দটি 'গণহত্যা' ও 'শিশু হত্যার' সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অকপটে স্বীকার করেছেন ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত।

 

সম্প্রতি ইতাই সেগালের সঙ্গে দেওয়া এক অত্যন্ত খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ও হতাশাজনক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই মন্তব্যের মাধ্যমে মূলত পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সবচেয়ে বড় মিত্র দেশের সাধারণ জনগণের কাছে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেটিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে।

 

সাবেক এই শীর্ষ নেতার মতে, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমেরিকান জনগণের একটি বিশাল অংশের কাছে ইসরায়েল একটি চরম নেতিবাচক ব্র্যান্ড বা পরিচয়ে পরিণত হয়েছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

 

সাক্ষাৎকারে এই ভয়াবহ ভাবমূর্তি সংকটের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে নাফতালি বেনেত একটি বাস্তবসম্মত ও নিখুঁত তুলনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে যদি কোনো আমেরিকান শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয় যে 'ইতালি' শব্দটি শুনলে তাদের মনে সবার আগে কী ভেসে ওঠে, তবে তারা অবলীলায় বলবে পাস্তা বা স্প্যাগেটির কথা।

 

কিন্তু সেই একই শিক্ষার্থীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় 'ইসরায়েল' শব্দটি তাদের মনে কী ধারণার জন্ম দেয়, তখন তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেয়, 'শিশু হত্যাকারী'। বেনেতের মতে, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ইসরায়েলের বর্তমান পরিচয় কেবলই একটি গণহত্যাকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং এটাই এখনকার সবচেয়ে রুঢ় বাস্তবতা।

 

অবশ্য ইসরায়েলের এই চরম নেতিবাচক ভাবমূর্তির দায়ভার নিজেদের কাঁধ থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টাও করেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন যে, বিগত পঁচিশ বছর ধরে কাতারের অর্থায়নে পরিচালিত কথিত এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তার অভিযানের কারণেই আমেরিকান তরুণদের মগজধোলাই করা হয়েছে।

 

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও বাস্তবতার হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। ইসরায়েল তাদের নিজস্ব হাসবারা বা রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো দখলদারিত্ব ও গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করতে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে আসছে।

 

কিন্তু গাজার মাটিতে চলমান ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে তাদের সেই বিপুল অর্থব্যয় ও সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার কার্যত সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

 

ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা তরুণদের এই চরম ঘৃণার প্রত্যক্ষ ও প্রধান কারণ হলো অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার বাহিনীর চালানো চলমান ও অবিরাম সামরিক হত্যাযজ্ঞ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া এই একতরফা আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজারেরও বেশি নিরীহ ফিলিস্তিনি নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ বিষয়টি হলো, এই বিশাল সংখ্যক নিহতের মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই হলো নারী এবং নিষ্পাপ শিশু, যাদের সঙ্গে কোনো সশস্ত্র সংঘাতের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে গত অক্টোবর মাসে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেটিও ফিলিস্তিনিদের ওপর চরম সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক সকল নিয়মকানুন ও চুক্তি লঙ্ঘন করে বারবার সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। এসব বেআইনি হামলার ফলে নতুন করে আরও অন্তত এক হাজার তিনশো ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন এবং চার হাজার তিনশো জনেরও বেশি মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

 

গাজা উপত্যকার আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ও স্কুলসহ সার্বিক অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ এতই ব্যাপক যে, অঞ্চলটি নতুন করে পুনর্গঠন করতে কমপক্ষে সাত হাজার কোটি বা ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অনুমান করছে।

 

এই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সামরিক অভিযানের নেপথ্যের মূল কারিগররা বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থার চোখে একপ্রকার পলাতক আসামি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে।

 

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনো বহাল রয়েছে, যা বিশ্বের অন্তত ১২৫টি দেশে কার্যকর হওয়ার কথা। এই আইনি প্রক্রিয়ার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলি নেতাদের অবাধ বিচরণ চরমভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক জনমত জরিপের তথ্যগুলোও বেনেতের স্বীকারোক্তি এবং মাঠপর্যায়ের এই ভয়াবহ বাস্তবতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। প্রখ্যাত ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি নির্ভরযোগ্য জরিপে দেখা গেছে যে, আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত অন্তত ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে।

 

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমেরিকার ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মনে ইসরায়েল সম্পর্কে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।

 

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের ধসে পড়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টায় ইসরায়েলপন্থী আইনপ্রণেতারা সম্প্রতি ইসরায়েলের পক্ষে বিষয়বস্তু প্রচারের জন্য ৭৩০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অঙ্কের জনকূটনীতি বা পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি বাজেট অনুমোদন করেছেন।

 

কিন্তু গাজার মাটিতে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নির্মম বাস্তবতা এবং রক্তাক্ত চিত্র ইসরায়েলের বহু বছর ধরে নির্মিত কৃত্রিম চেহারা বা মিথ্যা ভাবমূর্তিকে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। নাফতালি বেনেতের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মূলত বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের এমন একটি নৈতিক ও কূটনৈতিক পতনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যা এরই মধ্যে অত্যন্ত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং যা আর কোনোভাবেই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

 

- পার্সটুডে