মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, দেশটিতে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হওয়া ‘বিমান প্রতিরক্ষা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সামরিক অনুষ্ঠানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এই দাবি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরপ্রসারী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা এলহামি তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সমরাস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত বিশদ আলোচনা করেন।
তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমানগুলো ধ্বংস করার ক্ষেত্রে যে দেশীয় প্রযুক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ গোপন ও অত্যাধুনিক ছিল।
এই নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এতটাই নিখুঁত এবং বিস্ময়কর ছিল যে, পশ্চিমা মিত্রবাহিনীর আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর বৈমানিকরা টেরই পাননি ঠিক কোথা থেকে এবং কীভাবে তাদের ওপর এই বিধ্বংসী আঘাত হানা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে যে অভাবনীয় সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে, জেনারেল এলহামির এই বক্তব্য তারই একটি সুস্পষ্ট ও জোরালো বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের সুবিশাল আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিশ্ছিদ্র রাখতে দেশটির সেনাবাহিনীর নেওয়া কৌশলগত পদক্ষেপগুলোর একটি বিস্তৃত চিত্রও এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা।
তারা জানান, দেশের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক কাঠামোর কথা মাথায় রেখে মরুভূমি, দীর্ঘ সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং বিভিন্ন কৌশলগত দ্বীপসহ প্রায় তিন হাজার আটশোর বেশি স্পর্শকাতর স্থানে তাদের এই অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় মোতায়েন করা হয়েছে।
এই স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর রাডার ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, আকাশপথে যেকোনো শত্রুভাবাপন্ন যুদ্ধবিমান, নজরদারি ড্রোন বা দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশের সীমানায় অনুপ্রবেশ করা মাত্রই তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে।
মাতৃভূমি রক্ষায় ইরানের সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের দৃঢ় সংকল্পের বিষয়টি অত্যন্ত আবেগঘন ও জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক ও সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বহিরাগত যেকোনো আগ্রাসন থেকে নিজেদের মাতৃভূমিকে সুরক্ষিত রাখতে ইরানের আপামর জনসাধারণ মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, প্রয়োজন হলে আগামী বিশ প্রজন্ম ধরে মাতৃভূমির স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও তারা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবেন না। তার এই বক্তব্য মূলত সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ভেতরে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এবং তার বিপরীতে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা এক ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্যেরই একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বহন করে।
উল্লেখ্য, ইরানের এই অভাবনীয় সামরিক সাফল্যের দাবির পেছনে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ও সংঘাতময় সাম্প্রতিক ইতিহাস। চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে এক নজিরবিহীন, অতর্কিত ও ভয়াবহ সামরিক বিমান হামলা পরিচালনা করে।
সেই ধ্বংসাত্মক হামলায় স্বাধীন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করেন। এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড সমগ্র ইরানকে এক গভীর শোক এবং একই সঙ্গে প্রবল প্রতিশোধস্পৃহায় আচ্ছন্ন করে তোলে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর মতো অপূরণীয় ক্ষতির পরপরই ইরান সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করে। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যাপক ও বিধ্বংসী মাত্রার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায় তেহরান।
সেই ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের রেশ ধরেই পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন নতুন করে ইরানি আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে, তখনই ইরানের এই নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার চূড়ান্ত সক্ষমতার প্রমাণ দেয় বলে দাবি করছে দেশটির সামরিক নেতৃত্ব।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, ইরানের এই দুই শতাধিক আধুনিক বিমান ভূপাতিত করার দাবি এবং নিজেদের তৈরি সামরিক প্রযুক্তির প্রতি তাদের এই অবিচল আস্থা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আগামী দিনে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক রূপ দেবে বলেই গভীরভাবে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকরা।